মাগুরায় জ্বালানি তেল সরবরাহ পরিস্থিতিতে এক ধরনের অস্বচ্ছতা ও দ্বৈত চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারি দৈনিক মজুদ প্রতিবেদনে জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন মজুদ থাকার তথ্য মিললেও, বাস্তবে অনেক ফিলিং স্টেশনে খুচরা বিক্রি সীমিত বা বন্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়লেও, আড়ালে তেল বেচাকেনার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ মার্চ পর্যন্ত মাগুরায় মজুদ রয়েছে ডিজেল: প্রায় ১৯,৭০০ লিটার, পেট্রোল: প্রায় ১২,৫০০ লিটার, অকটেন: প্রায় ৬,০০০ লিটার।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, এই মজুদের বড় অংশ থাকা সত্ত্বেও একাধিক পাম্পে স্বাভাবিক বিক্রি বন্ধ বা সীমিত রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও পাম্পের সামনে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে।
মজুদ থাকা সত্ত্বেও বিক্রি না করার অভিযোগ উঠেছে যেসব পাম্পের বিরুদ্ধে, সেগুলো হলো মেসার্স মা ফিলিং স্টেশন (ভায়না মোড়), মেসার্স হানিফ ফিলিং স্টেশন (পারনান্দুয়ালি), মাগুরা ফিলিং স্টেশন, মেসার্স ফাতেমা ফিলিং স্টেশন (ভিটাসাইর) এবং মেসার্স আরাফাত ফিলিং স্টেশন (জাগলা)।
স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব পাম্পে দিনের বেলায় সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বিক্রি বন্ধ থাকলেও নির্দিষ্ট পরিবহন বা প্রভাবশালী গ্রাহকদের কাছে গোপনে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
একই মালিকানার একাধিক পাম্প নিয়ে সিন্ডিকেটের অভিযোগও উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী, মা ফিলিং স্টেশন, হানিফ ফিলিং স্টেশন ও মাগুরা ফিলিং স্টেশনের মালিক মোঃ শহিদ। এছাড়া ফাতেমা ও আরাফাত ফিলিং স্টেশনের মালিক মোঃ সাইফুল ইসলাম। একই মালিকানার একাধিক পাম্পে মজুদ স্থানান্তর করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক পাম্পে মজুদ কম দেখিয়ে অন্য পাম্প বা বাইরে বিক্রি করার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
দৈনিক প্রতিবেদনে কিছু পাম্পে মজুদ ‘শূন্য’ দেখানো হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পাম্পের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি পাম্পের বাইরে গোপনে বেশি দামে তেল বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এতে সরকারি হিসাব ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে অভিযোগ পাওয়া গেছে, কয়েকটি পাম্পে গ্রাহকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করা হচ্ছে। পাম্প বন্ধ রেখে লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলছে।
মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নাহার বলেন, জেলায় প্রতিটি পাম্পে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেউ মজুদ রেখে বিক্রি বন্ধ রাখলে বা অনিয়ম করলে তথ্য পেলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের একটি সূত্র বলছে, কিছু ব্যক্তি প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে বাজারে কৃত্রিম সংকটের গুজব ছড়াচ্ছে। তাদের দাবি, জেলার বেশ কিছু পাম্পে নিয়মিত বিক্রি চলছে।
তবে ভোক্তাদের প্রশ্ন মজুদ থাকলে খুচরা বিক্রি বন্ধ কেন? কেন একই মালিকানার পাম্পগুলোতেই বেশি অভিযোগ? কেন সরকারি হিসাবের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতা মিলছে না?
স্থানীয়রা মনে করছেন, কার্যকর নজরদারি ও রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির সুযোগে একটি অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিশেষজ্ঞদের মতে জরুরি পদক্ষেপ প্রতিটি পাম্পে লাইভ মজুদ ও বিক্রি মনিটরিং, হঠাৎ অভিযান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, একাধিক পাম্পের মালিকানায় বিশেষ নজরদারি এবং ভোক্তা অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও নিষ্পত্তি।
কাগজে মজুদ আর বাস্তবে সংকট এই দ্বৈত বাস্তবতা ভাঙতে এখন কঠোর নজরদারি ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প নেই। প্রশাসনের ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন মাগুরাবাসীর বড় প্রশ্ন।
এএন