রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ আর্তচিৎকার, তারপর সব চুপ। ফরিদপুর সদর উপজেলার আলিয়াবাদ ইউনিয়নের গদাধরডাঙ্গী গ্রামের খুশির বাজার এলাকা সোমবার রাতে প্রত্যক্ষ করল এক নারকীয় তাণ্ডব। এক যুবকের হাতে থাকা সাধারণ একটি কোদাল মুহূর্তেই হয়ে উঠল যমদূত। আপন দাদি ও ফুপুসহ মোট তিনজনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়েছে ঘাতক আকাশ মোল্যা (২৫)। এই লোমহর্ষক ঘটনায় স্তম্ভিত পুরো জেলা, শোকে পাথর হয়ে গেছে একটি জনপদ।
সোমবার সময় তখন রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টা। গ্রামের সাধারণ মানুষ যখন দিনের কাজ সেরে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই গদাধরডাঙ্গী গ্রামের হারুন মোল্যার বাড়িতে শুরু হয় চিৎকার। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হারুন মোল্যার ছেলে আকাশ মোল্যা হঠাৎ করেই চরম উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘর থেকে একটি কোদাল নিয়ে নিজ পরিবারের সদস্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি।
প্রথমে তিনি তার বৃদ্ধা দাদি ‘আমেনা বেগমকে (৮০)‘লক্ষ্য করে কোদাল দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। বৃদ্ধা আত্মরক্ষার সুযোগটুকুও পাননি। মাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন আকাশের আপন ফুপু ‘রাহেলা বেগম (৫০)।উন্মত্ত আকাশ তাকেও রেহাই দেয়নি। ঘাতকের ধারালো কোদালের আঘাতে ঘটনাস্থলেই নিথর হয়ে পড়েন এই দুই নারী।
বাড়ির ভেতর থেকে আসা নারী ও বৃদ্ধার গগনবিদারী চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। পৈশাচিক এই দৃশ্য দেখে পাশের বাড়ির রিকশাচালক ‘কাবুল চৌধুরী (৩০)ঘাতক আকাশকে বাধা দিতে যান। কিন্তু ক্রোধে অন্ধ আকাশ প্রতিবেশী কাবুলের ওপরও চড়াও হন। কোদালের উপর্যুপরি আঘাতে কাবুল চৌধুরীও মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
এ সময় আরও একজন প্রতিবেশী আকাশকে থামাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। বর্তমানে তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর ঘাতক আকাশ মোল্যা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বাড়ির উঠানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তিনটি নিথর দেহ। চাপ চাপ রক্তে ভিজে গেছে আঙিনা। গ্রামবাসীদের ভাষায়, ‘এমন দৃশ্য এ জন্মে দেখিনি। কোদাল দিয়ে মানুষকে এভাবে কুপিয়ে মারা যায়, তা কল্পনাও করা যায় না।
রাতের অন্ধকারে খুশির বাজার এলাকায় এখন কবরের নিস্তব্ধতা। প্রতিটি ঘরে ঘরে আতঙ্ক। স্থানীয়দের মনে একটাই প্রশ্ন—কেন এই হত্যাকাণ্ড? আকাশ কি আগে থেকেই এমন ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা পারিবারিক বিরোধ রয়েছে?
খবর পেয়ে রাত ১১টার দিকে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ মরদেহগুলো উদ্ধার করে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, এটি একটি চরম বর্বরোচিত ঘটনা। আমরা ঘটনাস্থল থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করেছি। ঘাতক আকাশ তার পরিবারের আপন দুই সদস্যসহ একজন প্রতিবেশীকে হত্যা করেছে। ঠিক কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা নিয়ে আমরা ধোঁয়াশায় আছি। তাকে গ্রেপ্তারে আমাদের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। আশা করছি দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনতে পারব।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন হত্যার মোটিভ বা কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত। প্রাথমিক তদন্তে কয়েকটি দিক উঠে আসছে:
১. মানসিক ভারসাম্যহীনতা: স্থানীয় কিছু মানুষের দাবি, আকাশ মাঝেমধ্যেই অস্বাভাবিক আচরণ করত। তবে সেটি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মতো কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
২. পারিবারিক বিরোধ: সম্পত্তি বা পারিবারিক কোনো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ক্ষোভ থেকে এই ঘটনা ঘটেছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
৩. মাদকাসক্তি: আকাশ কোনো মরণনেশায় আসক্ত ছিল কি না, যার প্রভাবে এই উন্মাদনা—সেটিও পুলিশের তদন্তের অন্যতম প্রধান বিষয়।
মঙ্গলবার সকালে গদাধরডাঙ্গী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শত শত উৎসুক মানুষ ভিড় করেছেন সেই অভিশপ্ত বাড়ির সামনে। নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিবেশী কাবুল চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে রিকশাচালক শ্রমিকদের মধ্যেও। একজন নিরপরাধ প্রতিবেশী সাহায্য করতে গিয়ে প্রাণ হারানোয় ক্ষোভ বিরাজ করছে জনমনে।
ফরিদপুরের এই ত্রি-হত্যা মামলাটি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। আপন রক্ত আর প্রতিবেশীর রক্তে রঞ্জিত কোদালটি এখন সমাজ ও আইন-শৃঙ্খলার সামনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। কেন তরুণ প্রজন্ম এত উগ্র হয়ে উঠছে? কেন সামান্য বিরোধ বা মানসিক অস্থিরতায় আপনজনদের জীবন নিতেও দ্বিধা করছে না? ঘাতক আকাশ গ্রেপ্তার হলেই হয়তো বেরিয়ে আসবে এই নির্মম ট্র্যাজেডির প্রকৃত কারণ। আপাতত গদাধরডাঙ্গীবাসীর অপেক্ষা শুধু ন্যায়বিচারের।
এএন