চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে গত মার্চ মাসে সংঘটিত হওয়া ১১ বছর বয়সী এক অসহায় শিশুকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় শ্বাসরোধ করে হত্যার লোমহর্ষক ঘটনার মূল হোতা ও এজাহারনামীয় প্রধান আসামি মো. ফয়সালকে (১৯) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঘটনার পর দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে ছদ্মবেশ ধারণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে ধরা পড়েছে এই নরপশু। গতকাল বুধবার রাতে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার নিলক্ষী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত টংকপাড়া এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে হাটহাজারী থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী অঞ্চল) কাজী মো. তারেক আজিজ গণমাধ্যমকে এই চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গ্রেপ্তারের পর আসামি ফয়সালকে চট্টগ্রামে এনে আজই আদালতে সোপর্দ করা হলে, সে বিচারকের সামনে নিজের পৈশাচিক অপরাধের কথা স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ মার্চ (মঙ্গলবার) দুপুরের পর থেকে হাটহাজারী থানার কলোনি এলাকার বাসিন্দা ওই ১১ বছর বয়সী কন্যাশিশুটিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শিশুটির বাবা শারীরিক ও মানসিকভাবে একজন প্রতিবন্ধী এবং মা স্থানীয় একটি তৈরি পোশাক কারখানার সাধারণ শ্রমিক।
মা যখন কারখানায় ডিউটিতে ছিলেন, সেই সুযোগে কলোনির ফাঁকা পরিবেশ থেকে শিশুটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। দিনভর সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও মেয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অসহায় মা-বাবা।
এর ঠিক দুই দিন পর, অর্থাৎ ২৬ মার্চ (স্বাধীনতা দিবসের দিন) সকালে ওই শিশুর বাড়ির ঠিক পাশেই অবস্থিত একটি তুলার বাণিজ্যিক গুদাম থেকে তীব্র ও অসহ্য দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করে। দুর্গন্ধের তীব্রতা বাড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা গুদামের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে তুলার স্তূপের আড়ালে ওই নিখোঁজ শিশুর অর্ধগলিত, রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
খবর পেয়ে হাটহাজারী থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। সুরতহাল ও প্রাথমিক ময়নাতদন্তের পর পুলিশ শতভাগ নিশ্চিত হয় যে, শিশুটিকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে এবং অপরাধ লুকাতে লাশটি ওই গুদামের ভেতরে ফেলে রাখা হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর পরই পুলিশ ওই এলাকার অপরাধীকে শনাক্ত করতে চারপাশের সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অকাট্য ভিডিও ক্লু পায় পুলিশ।
ফুটেজে দেখা যায়, গত ২৪ মার্চ শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে একই কলোনির বাসিন্দা মো. ফয়সাল (১৯) ওই ১১ বছরের শিশুটিকে চকলেটের প্রলোভন বা অন্য কোনো উপায়ে ফুসলিয়ে কলোনির পাশের ওই তুলার গুদামের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন। এর বেশ কিছুক্ষণ পর, সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যায় ফয়সাল একাই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে এবং নার্ভাস ভঙ্গিতে গুদাম থেকে বেরিয়ে দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগ করছেন।
এই ফুটেজটি দেখার পর পুলিশের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ফয়সালই এই নির্মম ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের একমাত্র ঘাতক। ২৬ মার্চ রাতে নিহতের মা বাদী হয়ে মো. ফয়সালের নাম উল্লেখ করে হাটহাজারী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের বিষয়টি টের পেয়ে এবং পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করেছে জানতে পেরে ঘাতক ফয়সাল তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ করে অতি দ্রুত চট্টগ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। পেশায় দিনমজুর এই যুবকের আদি বাড়ি বরিশাল জেলায় হলেও, সে তার নিজের গ্রামের বাড়িতে না গিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় আত্মগোপন করে রাজমিস্ত্রি ও দিনমজুরের কাজ করে আসছিল, যাতে পুলিশ তাকে ট্র্যাক করতে না পারে।
অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, আসামি অত্যন্ত চতুরতার সাথে বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করছিল। তবে আমাদের একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল এবং তথ্য-প্রযুক্তির বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তার গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছিল।
গতকাল বুধবার আমরা সুনির্দিষ্ট ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হই যে, ফয়সাল নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার নিলক্ষী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত টংকপাড়া এলাকায় শ্রমিকের ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। এরপর হাটহাজারী থানা পুলিশের একটি দল সেখানে হানা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
চট্টগ্রামে নিয়ে আসার পর আজ ফয়সালকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই সিসিটিভি ফুটেজের কথা শুনে সে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে। পরে সে আদালতের বিচারকের কাছে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে ফয়সাল স্বীকার করেছে যে, সে অনেক দিন ধরেই ওই প্রতিবন্ধী বাবার শিশু সন্তানটিকে একা পেয়ে লোলুপ দৃষ্টি দিচ্ছিল। ২৪ মার্চ দুপুরে শিশুটির মা কারখানায় চলে যাওয়ার পর সে শিশুটিকে কৌশলে তুলার গুদামে নিয়ে যায় এবং সেখানে জোরপূর্বক পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ চালায়।
ধর্ষণের পর শিশুটি ব্যথায় চিৎকার করতে থাকলে এবং ঘটনাটি সবাইকে বলে দেবে বলে কান্না শুরু করলে, ফয়সাল তার মুখ চেপে ধরে এবং গলার ওপর চেপে বসে শ্বাসরোধ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশটি তুলার বস্তার আড়ালে লুকিয়ে রেখে সে স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে যায় এবং পরে রাতের ট্রেনে চট্টগ্রাম ছাড়ে। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত ফয়সালকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
বর্তমানে দেশজুড়ে একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী রামিসাকে ধর্ষণের পর কেটে টুকরো টুকরো করার রেশ কাটতে না কাটতেই, হাটহাজারীর এই হতদরিদ্র পরিবারের শিশুটির ওপর ঘটে যাওয়া পৈশাচিকতার বিস্তারিত বিবরণ মানুষকে নতুন করে স্তম্ভিত করেছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের সমাজে যারা সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত- যেমন এই মামলার ক্ষেত্রে বাবা একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং মা একজন স্বল্প আয়ের পোশাক শ্রমিক- তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা আজ সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে। মায়েরা যখন পেটের দায়ে কাজে যান, তখন এই অরক্ষিত শিশুরা কলোনি বা বস্তি এলাকায় বখাটে ও খুনিদের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে।
হাটহাজারী এলাকার সর্বস্তরের মানুষ ও নিহতের মা এই মামলার প্রধান আসামি ফয়সালের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি তথা ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।
হাটহাজারী থানা পুলিশ জানিয়েছে, যেহেতু সিসিটিভি ফুটেজ এবং আসামির নিজের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মতো দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি উপাদান তাদের হাতে রয়েছে, তাই ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়া মাত্রই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে একটি নিশ্ছিদ্র চার্জশিট (তদন্ত প্রতিবেদন) দাখিল করা হবে, যাতে এই নরপশুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।
এএন