মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার দাড়িয়াপুর ও সব্দালপুর ইউনিয়নের দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পরদিন মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজনকে জড়ো করার ঘটনায় এলাকায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই মসজিদের মাইক ব্যবহার করে গণজমায়েতের ডাক দেওয়া হয়। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বর্তমানে এলাকা শান্ত রয়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার সাচিলাপুর বাজারে একটি মোবাইল রিচার্জকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগবিতণ্ডা মুহূর্তের মধ্যে দুই গ্রামের সংঘর্ষে রূপ নেয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হৃদয় টেলিকমে রিচার্জ করতে যাওয়া এক গ্রাহকের সঙ্গে দোকান মালিকের ভুল রিচার্জ নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পরে উভয় পক্ষের লোকজন ঘটনাস্থলে জড়ো হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় দারিয়াপুর গ্রামের শরীফ শেখ (৩৫) এবং তারাউজিয়াল গ্রামের প্রবল (৪০) ও শাহজাহান (৩৫) আহত হন।
আহতদের শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে সাচিলাপুর বাজারের কয়েকটি দোকান ও একাধিক বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
শনিবার সরেজমিনে গিয়ে তারাউজিয়াল এলাকায় ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, অন্তত সাত থেকে আটটি বাড়ি এবং কয়েকটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৃত আলম মোল্লার বাড়ির সামনের তিনটি দোকান ও বসতঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্রও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন।
তবে সংঘর্ষের পরদিন সকালে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় মসজিদের মাইক ব্যবহার করে লোকজনকে জড়ো করার ঘটনায়।
সারঙ্গদিয়া গ্রামের বাসিন্দা শেখ আবু সাঈদ বলেন, শুক্রবার সংঘর্ষের পর শনিবার সকালে তারাউজিয়াল ও আমতৈল বাজার এলাকার মসজিদে মাইকিং করে লোকজনকে স্কুল মাঠে যেতে বলা হয়। পরে পুলিশ ও স্থানীয় নেতারা এসে উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। স্থানীয় বাসিন্দা আরএস শাহিন বলেন, মসজিদের মাইক ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে ব্যবহার হওয়া উচিত। সংঘর্ষের পর এমন ঘোষণা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নিশান মোল্লা নামের এক বাসিন্দা বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও গ্রুপিংয়ের কারণে এলাকায় বারবার উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অথচ স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, সংঘর্ষের ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে এবং দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংঘর্ষের পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল নাহিয়ান, শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছি এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি।
সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বদরুল আলম হিরো বলেন, সংঘর্ষে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আব্বাস উদ্দিন বলেন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। তবে প্রশাসন ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, সংঘর্ষের খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি রাখা হয়েছে এবং কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল নাহিয়ান বলেন, প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিল সংঘর্ষ যাতে আর না বাড়ে এবং কোনো পক্ষ যাতে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ছোটখাটো বিরোধ দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি রিচার্জ সংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে দেখছেন না অনেকেই।
তাদের প্রশ্ন, একটি তুচ্ছ ঘটনা কীভাবে দুই ইউনিয়নের মধ্যে সহিংসতা, ভাঙচুর ও আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠল এবং সংঘর্ষের পরদিন মসজিদের মাইকে লোকজনকে জড়ো করার প্রয়োজন কেন দেখা দিল? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এম জি