ইচ্ছা, অধ্যবসায় আর ঐশ্বরিক অনুগ্রহের মেলবন্ধন ঘটলে যে কোনো কঠিন লক্ষ্যও কত সহজে ছোঁয়া যায়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কুমিল্লার এক কিশোর। বয়স মাত্র তেরো। এই বয়সে যখন অন্য সাধারণ শিশুরা খেলাধুলা আর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রাথমিক ধাপগুলো পেরোতে ব্যস্ত, তখন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার পুকুরপাড় গ্রামের কিশোর মুহাম্মদ আরাফাত হোসেন গড়েছে এক বিরল ইতিহাস। মাত্র ২০ মাসের (১ বছর ৮ মাস) সংক্ষিপ্ত সময়ে পবিত্র কোরআনের ৩০টি পারা সম্পূর্ণ মুখস্ত করে সে লাভ করেছে 'হাফেজ' হওয়ার গৌরবময় উপাধি।
একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের এই অসাধারণ কৃতিত্বের খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই গোটা কুমিল্লা জেলা জুড়ে এক উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। আরাফাতের এই সাফল্যে শুধু তার পরিবার বা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষই নয়, বরং তার সহপাঠী, শিক্ষক এবং সমগ্র এলাকাবাসী গর্বিত ও উদ্বেলিত।
স্বপ্নের শুরু এবং একটি পরিবারের আকুলতা
১৩ বছর বয়সী মুহাম্মদ আরাফাত হোসেন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার অন্তর্গত পুকুরপাড় গ্রামের মো. আকতার হোসেন ও শিখা আক্তার দম্পতির সন্তান। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আরাফাতের জন্মের পর থেকেই তার বাবা-মায়ের মনে একটি সুপ্ত ও গভীর স্বপ্ন ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল। তারা চেয়েছিলেন তাদের সন্তান যেন বড় হয়ে পবিত্র কোরআনের আলোয় নিজের জীবনকে আলোকিত করে এবং একজন হাফেজ হিসেবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করে।
সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং ধর্মীয় শিক্ষার বুনিয়াদ শক্ত করার লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ১ মার্চ তাকে একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি হলো ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার চট্টগ্রাম বারীয়া দরবার শরীফের বিশেষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত 'মুহিব্বানে রহমাতুল্লিল আলামিন হাফেজিয়া মাদ্রাসা'। সদর ইউনিয়নে অবস্থিত এই মাদ্রাসায় ভর্তির মাধ্যমেই শুরু হয় আরাফাতের জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
মাদ্রাসার প্রাথমিক স্তর বা নূরানী বিভাগে ভর্তির পর থেকেই আরাফাতের মধ্যে এক ভিন্ন ধরনের একাগ্রতা লক্ষ্য করা যায়। অক্ষরের সাথে পরিচয় পর্ব চুকিয়ে সে দ্রুতই কোরআন তিলাওয়াতের প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করে। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সে আনুষ্ঠানিকভাবে মাদ্রাসার 'হিফজ' (কোরআন মুখস্তকরণ) বিভাগে পা রাখে।
২০ মাসের কঠিন সাধনা ও শিক্ষকদের তত্ত্বাবধান
হিফজ বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় আরাফাতের মূল পরীক্ষা। সাধারণত একজন শিক্ষার্থীর পবিত্র কোরআনের ৩০টি পারা সম্পূর্ণ মুখস্ত করতে ৩ থেকে ৫ বছর, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যায়। কিন্তু আরাফাত নিয়তিকে যেন নিজের মেধার অধীনস্থ করেছিল। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো হৃদয়ে ধারণ করার এক অবর্ণনীয় সাধনায় মগ্ন থাকত এই কিশোর।
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক এবং আরাফাতের মূল হিফজ শিক্ষক হাফেজ মুহাম্মদ রবিউল্লাহ সিকদার এই বিষয়ে তার বিস্ময় ও ভালো লাগার কথা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, শুরু থেকেই আরাফাত অন্য সাধারণ দশটা শিক্ষার্থীর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। পড়াশোনার প্রতি তার যে গভীর আগ্রহ আর নিষ্ঠা ছিল, তা এই বয়সের শিশুদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় না। সে ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমী, মনোযোগী ও প্রখর মেধার অধিকারী। আমরা শিক্ষকরা তাকে যতটুকু পড়া দিতাম, সে তার চেয়েও বেশি নিখুঁতভাবে তা মুখস্ত করে আমাদের শোনাত। নিয়মিত অনুশীলন এবং নিজের ভেতর থাকা এক দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির কারণেই সে মাত্র ২০ মাসে এই অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান, গাইডলাইন এবং আরাফাতের নিজস্ব অক্লান্ত পরিশ্রমই এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
‘আল্লাহর রহমত ও ওস্তাদদের দোয়ায় আমি সফল’
নিজের এই বিরল অর্জনের পেছনে কোনো জাদুমন্ত্র নয়, বরং মহান আল্লাহর দয়া এবং নিয়মানুবর্তিতাকেই প্রধান নিয়ামক মনে করে কিশোর হাফেজ মুহাম্মদ আরাফাত হোসেন।
লাজুক হাসিতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সে বলে, আমি সবসময় হুজুরদের দেওয়া নির্ধারিত পড়ার চেয়ে কিছুটা বেশি পড়ার ও মুখস্ত করার চেষ্টা করতাম। যখনই ক্লান্তি আসত, তখনই মা-বাবার স্বপ্নের কথা মনে পড়ত। আল্লাহর অশেষ রহমত, আমার মা-বাবার রাতদিনের দোয়া এবং মাদ্রাসার ওস্তাদদের আন্তরিক ভালোবাসাময় সহযোগিতার কারণেই আজ আমি ৩০ পারা কোরআন সম্পূর্ণ নিজের হৃদয়ে ধারণ করতে পেরেছি।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে এই খুদে হাফেজ অত্যন্ত পরিপক্বতার সাথে জানায়, সে কেবল কোরআন মুখস্ত করেই থেমে থাকতে চায় না। তার মূল লক্ষ্য হলো আগামীতে একজন বড় মাপের আলেম ও ইসলামী গবেষক হওয়া, যেন সে ইসলামের সঠিক জ্ঞান ও শিক্ষার মাধ্যমে মানবতা এবং দেশের মানুষের প্রকৃত খেদমত বা সেবা করতে পারে। সে দেশের সব মানুষের কাছে তার এই ভবিষ্যৎ স্বপ্নের জন্য দোয়া চেয়েছে।
বাবা-মায়ের চোখে আনন্দের অশ্রু
সন্তানের এমন গৌরবময় সাফল্যে আরাফাতের বাবা মো. আকতার হোসেনের চোখে এখন আনন্দের অশ্রু। দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর লালন করা স্বপ্ন এভাবে বাস্তব রূপ নেবে, তা ভেবে তিনি আবেগাপ্লুত।
অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ছেলেকে কোরআনের হাফেজ বানানো আমাদের বিয়ের পর থেকেই এক দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সেই স্বপ্ন আজ পূরণ করেছেন, এর চেয়ে বড় আনন্দ একজন বাবার জন্য আর কী হতে পারে! আমি সমাজের সবার কাছে আমার সন্তানের জন্য দোয়া চাই। সে যেন শুধু হাফেজ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দ্বীনি শিক্ষায় আরও উচ্চ স্তরে উন্নীত হতে পারে এবং নিজের জীবনকে ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করতে পারে।
মা শিখা আক্তারও ছেলের এই সাফল্যে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছেন এবং ছেলের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন।
এলাকাবাসী ও সমাজ সচেতনদের মূল্যায়ন
আরাফাতের এই অভাবনীয় সাফল্য কেবল তার পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো মুরাদনগর ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় এক ইতিবাচক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এসে খুদে হাফেজকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন এবং তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন।
স্থানীয় শিক্ষা অনুরাগীদের মতে, বর্তমান যুগে যখন কিশোর ও তরুণ সমাজ বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত অপব্যবহার, মাদকের ছোবল কিংবা নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন ১৩ বছরের এক কিশোরের মাত্র ২০ মাসে কোরআন মুখস্ত করার এই ঘটনা সমাজের জন্য এক বিরাট ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক পারিবারিক শিক্ষা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আমাদের দেশের নতুন প্রজন্ম কত বড় বড় সাফল্য বয়ে আনতে পারে।
মুহিব্বানে রহমাতুল্লিল আলামিন হাফেজিয়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আরাফাতের এই অনন্য কৃতিত্বকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে আগামীতে একটি বিশেষ দোয়া ও দস্তারবন্দী (পাগড়ি প্রদান) অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। সেখানে আরাফাত ও তার পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।
কিশোর হাফেজ মুহাম্মদ আরাফাত হোসেনের এই গল্পটি আগামী দিনের শত শত শিক্ষার্থীর জন্য এক আলোকবর্তিকা ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মেধা, সুযোগ আর চেষ্টার সঠিক সমন্বয় ঘটলে যেকোনো অসম্ভবকে যে জয় করা যায়- কুমিল্লার এই ১৩ বছরের কিশোর তা আরও একবার বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করে দিল।
এএন