গত ২৪ ঘণ্টার রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে কুমিল্লা নগরী। বিশেষ করে সোমবার সকালের মাত্র তিন ঘণ্টার ভারী বর্ষণে নগরের অধিকাংশ সড়ক ও বসতবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই চরম ভোগান্তি মাথায় নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে কয়েক হাজার পরীক্ষার্থীকে। অনেককে নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে যেতে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিত না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সোমবার দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কুমিল্লায় ১৩৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১০৭ মিলিমিটার। মূলত এই কয়েক ঘণ্টার অতিবৃষ্টিতেই পুরো শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর প্রধান তিনটি এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র-কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ এবং কুমিল্লা সরকারি কলেজ কেন্দ্রে কোমরসমান পানি জমেছে। মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা যায়। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ পথ হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে পরীক্ষা দিতে যান। সড়কে অটোরিকশার তীব্র সংকট থাকায় পরীক্ষার্থীদের গুনতে হয়েছে ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি ভাড়া।
এদিকে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হয়। সোমবারের বৃষ্টি ছিল আকস্মিক, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা স্থগিত করার মতো পর্যাপ্ত সময় ছিল না।
জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। নগরীর অধিকাংশ বাসাবাড়ির নিচতলা এবং দোকানপাটে পানি ঢুকে গেছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের নিচতলা প্লাবিত হওয়ায় সেবা নিতে আসা রোগীরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন। জলাবদ্ধতার কারণে ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের কবি নজরুল হলের ছাত্রাবাসে সাপ ঢুকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
দৌলতপুর এলাকার মুদি দোকানি ফেরদৌস আলম জানান, ‘ভোররাতের টানা বৃষ্টিতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দোকানে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে।’ ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘পচা পানি আর দুর্গন্ধের কারণে হলে থাকা দায় হয়ে পড়েছে, তার ওপর সাপের আতঙ্ক তো আছেই।’
কুমিল্লা আবহাওয়া উপকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছৈয়দ আরিফুর রহমান বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার সকাল ছয়টা থেকে নয়টা পর্যন্ত ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। মূলত এ তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারী বর্ষণের সতর্কতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে।’
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছে সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি। তবে করপোরেশনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে জানানো হয়েছে, অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট সাময়িক জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিচ্ছন্নতা ও জরুরি সেবাদানকারী দলগুলো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নগরবাসীকে ধৈর্য ধারণ ও সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জেএইচআর