কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে চরম চিকিৎসক সংকট বিরাজ করছে। ২৫ জন বিশেষজ্ঞ ও মেডিকেল অফিসারের পদ অনুমোদিত থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮ জন চিকিৎসক। ফলে জেলার অন্যতম বৃহৎ ও জনবহুল এই উপজেলার প্রায় ৭ লাখ মানুষের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থলটি কার্যত সীমিত জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালটিতে প্রয়োজনীয় এক্স-রে মেশিন না থাকায় রোগ নির্ণয়েও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। এতে প্রতিদিন শত শত রোগী ভোগান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন অথবা বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন বিভিন্ন ইউনিয়ন ও দুর্গম এলাকা থেকে কয়েকশ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক না থাকায় বহির্বিভাগে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক রোগী কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পান না। বিশেষ করে গাইনি, সার্জারি, অর্থোপেডিক, কার্ডিওলজি, শিশু, চক্ষু ও অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় সাধারণ মেডিকেল অফিসারদের দিয়েই কোনো রকমে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ- দুই দিক থেকেই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
দুর্গম চরাঞ্চল থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা অভিযোগ করেন, একজন চিকিৎসকের কাছে প্রতিদিন অতিরিক্ত সংখ্যক রোগী থাকায় পর্যাপ্ত সময় নিয়ে রোগী দেখা সম্ভব হয় না। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও অনেক সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। জরুরি অস্ত্রোপচার কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের অন্যত্র রেফার করা হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে না থাকায় রোগ নির্ণয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট। হাড় ভাঙা, বুকে সমস্যা কিংবা অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে এক্স-রে করার প্রয়োজন হলে রোগীদের বাধ্য হয়ে উপজেলা সদর বা আশপাশের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি চিকিৎসা শুরু করতেও বিলম্ব হচ্ছে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় অনেক সময় চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনসংখ্যা ও রোগীর চাপের তুলনায় দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান ৫০ শয্যার সক্ষমতা অনেক আগেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসায় অনেক সময় শয্যা না পেয়ে রোগীদের মেঝেতে বা বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। তাই দ্রুত হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, আধুনিক এক্স-রে মেশিনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং জনবল বৃদ্ধি করে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তহিদুল হাসান তুহিন বলেন, অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম থাকায় কিছুটা চাপের মধ্যে সেবা দিতে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সীমিত জনবল নিয়েও হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে সেবার মান আরও উন্নত হবে।
দৌলতপুর উপজেলার বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত শূন্য পদে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, হাসপাতালের জন্য আধুনিক এক্স-রে মেশিন সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই যে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন, তা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এএন