ইউরোপের উন্নত দেশ ইতালিতে ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মাদারীপুরের অর্ধশতাধিক তরুণকে মানবপাচার চক্রের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভিটেমাটি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়েও ইতালির বদলে তাদের ঠিকানা হয়েছে লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের আস্তানায়।
সেখানে জিম্মি করে চালানো হচ্ছে অমানুষিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও দেশে পাঠিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ। তবে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়ার পরও অধিকাংশ তরুণের কোনো সন্ধান মিলছে না। তারা জীবিত আছেন নাকি মারা গেছেন, তা নিয়েও চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারগুলো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের পূর্ব টুবিয়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকার অন্তত অর্ধশতাধিক যুবক এই ভয়ংকর মানবপাচার চক্রের শিকার হয়েছেন। স্থানীয় দালাল মজিবর শেখ, শামচু চৌকিদার ও মাহাবুল মুন্সির মাধ্যমে মূল দালাল সুমনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি
পূর্ব টুবিয়া গ্রামের তরুণ রাহাত তালুকদার ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ২২ লাখ টাকার চুক্তিতে দালাল চক্রের মাধ্যমে ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। কিন্তু তাকে ইতালিতে না নিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি সশস্ত্র মাফিয়া চক্রের কাছে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
পরে রাহাতের মুখে গামছা বেঁধে অমানুষিক নির্যাতনের ভিডিও দেশে পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। সেই ভিডিও দেখিয়ে আরও ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করা হলেও এরপর থেকে রাহাতের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
রাহাতের মা মায়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা দালাল সুমনের বিচার চাই। আমাদের সন্তানদের আমাদের বুকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তারা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, আমরা তাও জানি না।”
একই গ্রামের মস্তফা হাওলাদারও প্রায় নয় মাস আগে ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন। তাকেও লিবিয়ায় জিম্মি করে বর্বর নির্যাতন করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
মস্তফার মা বিলকিস আরা বেগম জানান, ছেলেকে জীবিত ফেরত পাওয়ার আশায় ইতোমধ্যে দালাল চক্রকে ৫০ লাখ টাকা দিয়েছেন তারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত ছেলের কোনো খোঁজ পাননি।
এদিকে আরেক তরুণ আরাফাত কাজীর পরিবারও দালালদের হাতে ৫৩ লাখ টাকা তুলে দিয়েছে বলে জানা গেছে। আরাফাতের বড় ভাই মাহাবুব কাজী জানান, টাকা দেওয়ার পরও তার ভাইয়ের কোনো সন্ধান মিলছে না।
দিশেহারা পরিবার, বিচার দাবি এলাকাবাসীর
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিখোঁজ তরুণদের পরিবারে চলছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। স্বজনরা জানান, দালাল চক্র মাদারীপুরের সহজ-সরল যুবকদের টার্গেট করে সর্বস্বান্ত করছে। অনেক পরিবার ভিটেমাটি ও শেষ সম্বল বিক্রি করে মুক্তিপণের টাকা দিলেও সন্তানদের ফিরে পাচ্ছে না।
নিখোঁজ রাহাত তালুকদারের দুলাভাই জামাল মাতুব্বরসহ এলাকাবাসী জানান, মানবপাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত চক্রের মূল হোতা সুমনসহ সংশ্লিষ্টদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ, কেউ যেন প্রলোভনে পড়ে অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে পাড়ি না জমান।”
ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন মহলের দাবি, লিবিয়ায় জিম্মি থাকা তরুণদের উদ্ধারে প্রশাসন যেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয় এবং মানবপাচারের এই আন্তর্জাতিক চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনে।
এএন