একটি বর্ণাঢ্য নক্ষত্রের পতন

চিরবিদায় নিলেন ঢাকাই সিনেমার ড্যান্সিং কিং জাভেদ

বিনোদন ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম

টুপটাপ ঝরে পড়ছে সোনালি যুগের তারকারা। সেই মিছিলে আজ যোগ দিলেন ঢাকাই সিনেমার একসময়ের পর্দা কাঁপানো অ্যাকশন ও নৃত্যনির্ভর ছবির অবিসংবাদিত নায়ক ইলিয়াস জাভেদ। 

বুধবার সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। 

নায়ক জাভেদের সহধর্মিণী চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরী অত্যন্ত শোকাতুর কণ্ঠে তাঁর মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন এই অভিনেতা। শেষ কয়েক দিনে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছিল।

শেষ মুহূর্তের লড়াই ডলি চৌধুরী জানান, জাভেদ দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তবে জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি পরিবারের সান্নিধ্যে কাটাতে চেয়েছিলেন বলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে বাসাতেই রাখা হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সরা প্রতিদিন বাসায় এসে তাঁকে সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আজ বুধবার ভোরের দিকে তাঁর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে। 

ডলি চৌধুরী বলেন, সকালে দায়িত্বরত নার্সরা পরীক্ষা করে দেখেন জাভেদের শরীর একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমরা কালক্ষেপণ না করে অ্যাম্বুলেন্সে করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে জানান, হাসপাতালে আসার আগেই তিনি মারা গেছেন।

এক অনন্য যাত্রা জাভেদের চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু হয়েছিল অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং একজন দক্ষ নৃত্য পরিচালক হিসেবে। ষাটের দশকে যখন ঢাকাই সিনেমা মূলত উর্দু এবং বাংলা উভয় ভাষাতেই নির্মিত হতো, তখন তিনি কায়সার পাশার পরিচালনায় উর্দু সিনেমা মালান এর মাধ্যমে প্রথম নৃত্য পরিচালনা করেন। তাঁর নাচের তাল ও ভঙ্গি তৎকালীন দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। নায়ক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৪ সালে। 

উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র নয়ি জিন্দেগি এর মাধ্যমে তিনি প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক লোকগাথা, ফ্যান্টাসি এবং অ্যাকশন নির্ভর সিনেমায় অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের প্রিয় নায়ক।

আলোচিত চলচ্চিত্র ও পর্দার রসায়ন জাভেদ অভিনীত সিনেমার সংখ্যা দুই শতাধিক। তাঁর অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে মালকা বানু, অনেক দিন আগে, শাহজাদী, নিশান, রাজকুমারী চন্দ্রবান, কাজল রেখা, সাহেব বিবি, নরম গরম এবং তিন কন্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজকীয় পোশাক, তলোয়ারের লড়াই আর চমৎকার নাচের সমন্বয়ে তিনি পর্দায় যে জাদুকরী আবহ তৈরি করতেন, তা আজও প্রবীণ দর্শকদের স্মৃতিতে অম্লান। 

বিশেষ করে অভিনেত্রী রওশন জামিলের সঙ্গে তাঁর নাচের দৃশ্যগুলো ছিল তৎকালীন সিনেমার অন্যতম বড় আকর্ষণ। লোকজ গল্পের রাজপুত্র বা সেনাপতি হিসেবে জাভেদ ছিলেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ। তাঁর স্টাইল আর চুলের ছাঁট তরুণদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল।

চলচ্চিত্রাঙ্গনে শোকের ছায়া জাভেদের প্রয়াণে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। 

তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা বলছেন, জাভেদ কেবল একজন ভালো অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত অমায়িক মানুষ। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার সময়ও তাঁর মাঝে এক ধরণের প্রশান্তি লক্ষ্য করা যেত।

শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আজ বাদ আসর উত্তরার একটি স্থানীয় মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁকে বনানী কবরস্থানে বা তাঁর স্থায়ী ঠিকানায় সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে তাঁর স্ত্রী ডলি চৌধুরী জানিয়েছেন, আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে দাফনের চূড়ান্ত সময় ও স্থান সংবাদমাধ্যমকে জানানো হবে।

এক যুগের অবসান জাভেদের প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই সময়ের কথা, যখন সিনেমা ছিল সুস্থ বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। তিনি এমন এক প্রজন্মের শিল্পী ছিলেন যারা কঠোর পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে শূন্য থেকে নিজেদের গড়ে তুলেছিলেন। ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে, নাচের জাদুকর এবং ফ্যান্টাসি সিনেমার অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট হিসেবে। তাঁর আত্মা চিরশান্তি পাক।

জেএইচআর