ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন এবং মণি রত্নম— ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই দুই নাম যেন একে অপরের পরিপূরক। মণি রত্নমের জহুরির চোখই প্রথম চিনে নিয়েছিল বিশ্বসুন্দরীর তকমা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক সাধারণ তরুণীর অসামান্য অভিনয় প্রতিভা। ১৯৯৭ সালের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ইরুভার’ (Iruvar)-এর মাধ্যমে রূপালি পর্দায় অভিষেক হয়েছিল ঐশ্বরিয়ার। তবে এই রাজকীয় অভিষেকের পেছনে লুকিয়ে আছে হাড়ভাঙা খাটুনি, ভোরবেলার চরম ব্যস্ততা আর এক মজার মান-অভিমানের গল্প।
সম্প্রতি প্রখ্যাত নৃত্য পরিচালক বৃন্দা মাস্টার এক সাক্ষাৎকারে ‘ইরুভার’ ছবির শুটিংয়ের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঐশ্বরিয়ার এক অজানা ও মজাদার তথ্য ফাঁস করেছেন। বৃন্দা মাস্টারের বয়ানে উঠে এসেছে, কীভাবে মণি রত্নম এবং তাঁর টিম ঐশ্বরিয়াকে ভোর ৫টায় কাজ করতে গিয়ে ‘অত্যাচার’ করেছিলেন।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের আকাশে আজ যে ধ্রুবতারাটি সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল, তাঁর নাম ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার শুরুটা হয়েছিল দক্ষিণ ভারতীয় পরিচালক মণি রত্নমের হাত ধরে। মণি রত্নম এমন একজন পরিচালক, যিনি অভিনেতাদের থেকে সেরাটা নিংড়ে বের করে নিতে জানেন। আর সেই সেরাটা বের করতে গিয়েই কখনও কখনও তিনি হয়ে ওঠেন ‘কঠোর’। ‘ইরুভার’ ছবির শুটিং সেটে ঠিক এমন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন নবীন অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া।
‘ইরুভার’ ছবির অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গান ‘কান্নাই কাত্তিকোলারদে’ (Kannai Kattikolathey)। এই গানের কোরিওগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন বৃন্দা মাস্টার। গানটির একটি বিশেষ মিউজিক্যাল বিট বা তালের শুটিং করার জন্য মণি রত্নম সময় নির্ধারণ করেছিলেন ভোর ৫টা। শীতের সেই শেষ রাতে তখনও আকাশ পুরোপুরি ফর্সা হয়নি। সেই অন্ধকার থাকতেই ঐশ্বরিয়াকে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে সেটে আসতে বলা হয়েছিল।
বৃন্দা মাস্টার স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার আজও মনে আছে সেই মিউজিক পিসটির কথা। ঐশ্বরিয়া রিহার্সাল শেষ করে যখন সেটে এলেন, তখন মণি স্যার শটটি ভোর ৫টায় শিডিউল করেছেন। তখন রীতিমতো অন্ধকার। ঐশ্বরিয়াকে অত ভোরে তৈরি হয়ে আসতে দেখে তাঁর চোখে-মুখে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি ছিল। তিনি তামিল ভাষায় চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন ‘আইয়ো, আইয়ো! আমি তো মরে যাব। ওহ ঈশ্বর, আপনারা মানুষগুলোকে এভাবে অত্যাচার করছেন!’
ঐশ্বরিয়ার সেই মজার ‘আর্তনাদ’ সেদিনের সেটে হাসির রোল তুলেছিল। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পর সব অভিযোগ যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। বৃন্দা মাস্টারের মতে, সেই একটি শট ঐশ্বরিয়া যেভাবে দিয়েছিলেন, তা দেখে সেটের সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি খোদ মোহনলাল এবং সেটের অন্য পুরুষ কলাকুশলীরা তাঁর দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলেন না। বৃন্দা যোগ করেন, ঐশ্বরিয়া একজন অসামান্য নৃত্যশিল্পী। সেই ভোরে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল জাদুকরী।
বৃন্দা মাস্টার ঐশ্বরিয়ার সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের এক বিরল গল্পও শোনান। তখন ঐশ্বরিয়া বিশ্বসুন্দরী হননি, কেবল মডেলিং দুনিয়ায় পা রাখছেন। একটি পেপসির বিজ্ঞাপনে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।
বৃন্দা বলেন, আমি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে পারফর্ম করছিলাম। ঐশ্বরিয়া তখন কেবল মডেল। তিনি নিজে আমার কাছে এসে বলেছিলেন ‘আপনি খুব ভালো নাচেন’। আমি জানি না তাঁর আজ সেটা মনে আছে কিনা, কিন্তু সেদিন তাঁর মতো একজন সুন্দরী তরুণীর প্রশংসা পেয়ে আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। এমনকি আমার সহকর্মী ছেলেরা ঈর্ষা বোধ করছিল যে, ঐশ্বরিয়া তাদের দিকে না তাকিয়ে সরাসরি আমার নাচের প্রশংসা করছেন।
ঐশ্বরিয়ার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া প্রতিটি বড় পদক্ষেপে মণি রত্নমের অবদান অনস্বীকার্য। ‘ইরুভার’ দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীকালে ‘গুরু’ (Guru), ‘রাবণ’ (Raavan) এবং অতি সম্প্রতি ‘পোন্নিয়ান সেলভান’ (Ponniyin Selvan) ফ্র্যাঞ্চাইজিতে তাঁদের রসায়ন আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। মণি রত্নম ঐশ্বরিয়ার শারীরিক লাবণ্যের পাশাপাশি তাঁর অভ্যন্তরীণ অভিনয় ক্ষমতাকেও পর্দায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
বৃন্দা মাস্টারের মতে, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন কেবল তাঁর রূপের জন্য নয়, বরং তাঁর পেশাদারিত্বের জন্য আজ এই উচ্চতায়। ভোর ৫টার ‘অত্যাচার’ হোক বা টানা কয়েক ঘণ্টার রিহার্সাল— কাজের প্রতি তাঁর একাগ্রতা কখনও কমেনি।
তামিলনাড়ুর রাজনীতি এবং সিনেমার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া ‘ইরুভার’ ছবিটি এম. জি. রামচন্দ্রন, এম. করুণানিধি এবং জে. জয়ললিতার জীবনের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। বিশাল বাজেটের এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মোহনলাল, প্রকাশ রাজ, ঐশ্বরিয়া রাই, রেবতী, গৌতমী, টাবু এবং নাসার। এ. আর. রহমানের সংগীত এবং সন্তোষ সিভানের সিনেম্যাটোগ্রাফি এই ছবিটিকে কালজয়ী মর্যাদাদিয়েছে।
ঐশ্বরিয়া রাইয়ের ক্যারিয়ারের সেই ভোরে ৫টার শুটিং কেবল একটি কাজের শুরু ছিল না, তা ছিল সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর প্রথম সিঁড়ি। আজ যখন তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রের আইকন, তখন এই ফেলে আসা দিনগুলোর গল্প ভক্তদের মনে করিয়ে দেয় যে, কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
এএন