ফ্যাশন জগতের সবচেয়ে জমকালো রাত ‘মেট গালা’ প্রতি বছরই নতুন কোনো চমক নিয়ে হাজির হয়। তবে ২০২৬ সালের আয়োজনটি যেন ছাড়িয়ে গেছে আগের সব রেকর্ডকে। এবারের মেট গালার থিম ছিল ‘কস্টিউম আর্ট(Costume Art)এবং ড্রেস কোড নির্ধারিত হয়েছিল ।
৫ মে নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট-এর সিঁড়িতে যখন তারকারা পা রাখলেন, তখন মনে হচ্ছিল কোনো জাদুঘরের স্থির চিত্রগুলো প্রাণ পেয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
তৈরি করা পোশাক, হাতে আঁকা গাউন, থিয়েট্রিকাল এক্সেসরিজ এবং ধ্রুপদী চিত্রকর্মের রেফারেন্সে ঠাসা এই রাতটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি ‘লিভিং গ্যালারি’।
রেড কার্পেটের রাজকীয় প্রবেশ: ব্ল্যাকপিঙ্ক লিসা ও রিহানা
এবারের মেট গালার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন কে-পপ সেনসেশন ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর লিসা। তিনি রবার্ট উনের ডিজাইন করা একটি কাস্টম পোশাকে হাজির হন, যা আধুনিক স্থাপত্য এবং শৈল্পিক কারুকাজের এক অনন্য সংমিশ্রণ ছিল। তার এই লুকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
তবে প্রথা অনুযায়ী, রাতের শেষ এবং সবচেয়ে প্রতীক্ষিত উপস্থিতি ছিল ফ্যাশন আইকন রিহানার। এবারের কার্পেটে তিনি তার সঙ্গী এএসএপি রকি-র সাথে বেশ আগেই উপস্থিত হন। গ্লেন মার্টেনস-এর ডিজাইন করা মেইসন মার্জিয়েলা-র একটি কাস্টম মেটালিক 'ককুন' গাউনে তাকে দেখাচ্ছিল অপার্থিব। নিজের পোশাক সম্পর্কে রিহানা মজা করে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আমি ঝিনুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা একটি মুক্তো।‘তার সঙ্গী রকি নিজেকে সাজিয়েছিলেন শ্যানেল-এর পোশাকে।
বিয়ন্সের 'কুইন বে' অবতার
বিয়ন্সে এবারের মেট গালায় তার চেনা ‘কাউবয় হ্যাট’ লুকটি পেছনে ফেলে সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। অলিভিয়ার রাউস্টিং-এর ডিজাইন করা একটি কাস্টম 'স্কেলেটাল স্কার্পচারাল' গাউনে তিনি যেন এক প্রাচীন দেবী। ক্রিম এবং ডাস্ট ব্লু রঙের পালকযুক্ত ট্রেইন এবং মাথায় হীরা খচিত মুকুট তাকে সত্যিকারের ‘কুইন বে’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার সাথে কার্পেটে পোজ দিয়েছেন স্বামী জে-জি এবং কন্যা ব্লু আইভি।
নাওমি ওসাকার নাটকীয় রূপান্তর
টেনিস তারকা নাওমি ওসাকা এবারের মেট গালায় সবাইকে চমকে দিয়েছেন তার পোশাকের পরিবর্তনের মাধ্যমে। হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় তাকে দেখা যায় রবার্ট উনের একটি সাদা স্ট্রাকচারাল পোশাকে, যার কাঁধ ছিল অনেক উঁচুতে এবং মাথায় ছিল লাল পালকের মুকুট। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে তার হাত দুটি ছিল টকটকে লাল রঙে চুবানো, যা দেখে মনে হচ্ছিল রক্ত ঝরছে।
মেট গালার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তিনি তার উপরের পোশাকটি খুলে ফেলেন এবং ভেতরে থাকা একটি লাল পুঁতিখচিত স্লিক গাউন উন্মোচন করেন। এই গাউনটিতে মানুষের শরীরের আদল ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ওসাকার এই লুকটি মূলত কস্টিউম ইনস্টিটিউটের প্রদর্শনীতে থাকা একটি শিল্পকর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।
শিল্পকর্ম যখন পোশাকের ক্যানভাস
এবারের থিমের অন্যতম দিক ছিল পোশাককে সরাসরি ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করা। অভিনেত্রী অ্যান হ্যাথাওয়ে মাইকেল করসের একটি গ্রীক স্থাপত্য অনুপ্রাণিত স্ট্র্যাপলেস গাউন পরেছিলেন, যা ছিল সম্পূর্ণ হাতে আঁকা। তার পোশাকে সাদা রঙের শান্তির পায়রা (Dove of Peace) ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ডিজাইনার মাইকেল করস ভোগ-কে বলেন, তিনি আজ শান্তির দেবী।
অন্যদিকে, টিকটক তারকা জেসিকা কাইল নিজের গাউনটি নিজেই হাতে রাঙিয়েছেন। ক্লদ মোনের বিখ্যাত ‘ওয়াটার লিলি’ দৃশ্যটি তিনি তার রেশমি গাউনের ওপর ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। এমা চেম্বারলেন পরেছিলেন মুগলারের একটি হাতে আঁকা রংধনু রঙের বডি-হাগিং ড্রেস, যা তাকে একটি বিমূর্ত শিল্পের রূপ দিয়েছিল।
ধ্রুপদী চিত্রকর্মের ছোঁয়া
অনেক তারকা তাদের পোশাকের মাধ্যমে ইতিহাস ও বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর্মকে সম্মান জানিয়েছেন। লরেন সানচেজ বেজোস পরেছিলেন শ্যাপারেলি-র একটি গাউন, যা জন সিঙ্গার সার্জেন্টের ১৮৮৪ সালের বিখ্যাত পেইন্টিং ‘ম্যাডাম এক্স ‘দ্বারা অনুপ্রাণিত।
ভগের সম্পাদক ক্লো ম্যালি পরেছিলেন কলিন অ্যালেনের একটি অ্যাপ্রিকট অরেঞ্জ রঙের পোশাক, যা স্যার ফ্রেডেরিক লেইটনের‘ ফ্লেমিং জুন‘ চিত্রকর্মের প্রতিফলন। অভিনেত্রী লেনা ডানহাম এবং ভ্যালেন্টিনো ডিজাইনার আলেসান্দ্রো মিশেল মিলে তৈরি করেন একটি লাল পালকের পোশাক। এই পোশাকটি আর্তেমিসিয়া জেন্টিলেস্কির ‘জুডিথ স্লেয়িং হোলোফার্নেস‘ চিত্রকর্মের অনুপ্রেরণায় তৈরি। লেনা বলেন, তিনি চেয়েছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সাহসী নারী শিল্পীর কাজের অংশ হতে।
কো-চেয়ারদের উপস্থিতি এবং শ্যানেল-এর আভিজাত্য
এবারের মেট গালার কো-চেয়ার আন্না উইনটুর চিরাচরিত আভিজাত্য বজায় রেখেছেন। 'দ্য ডেভিল ওয়ারস প্রাডা ২' নিয়ে আলোচনার মাঝেও তিনি নীল রঙের বদলে বেছে নেন শ্যানেলের একটি মিন্ট গ্রিন এনসেম্বল। ম্যাথিউ ব্লেজির ডিজাইন করা এই পোশাকটিতে ছিল পালকের কেপ এবং পুঁতির কারুকাজ।
আরেক কো-চেয়ার নিকোল কিডম্যান পরেছিলেন শ্যানেলের গাঢ় লাল রঙের একটি পোশাক। ভেনাস উইলিয়ামস একটি একরঙা কালো অফ-শোল্ডার গাউনের সাথে স্বরোভস্কি হীরা খচিত নেকপিস পরেছিলেন। তার এই লুকটি রবার্ট প্রুইট-এর আঁকা তার নিজের একটি পোট্রেটের আদলে তৈরি করা হয়েছিল।
মেকআপ এবং প্রস্থেটিক্স: ব্যাড বানি ও কিম কারদাশিয়ান
শিল্পী ব্যাড বানি এবারের মেট গালায় সবাইকে ধাঁধায় ফেলে দেন। তিনি স্পেশাল এফেক্ট মেকআপ এবং ধূসর চুলের মাধ্যমে নিজেকে একজন বৃদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেন। হাতে ছিল লাঠি। তিনি মজা করে বলেন, এই লুকটি তৈরি করতে তার ৫৩ বছরসময় লেগেছে!
কিম কারদাশিয়ান সবসময়ই মেট গালায় আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন। এবার তিনি কোনো কাপড়ের গাউন নয়, বরং ১৯৬০-এর দশকে অ্যালেন জোনসের ডিজাইন করা একটি উজ্জ্বল কমলা রঙের মেটালিক বডি প্লেট পরেছিলেন। এটি ছিল মানব শরীরের এক শৈল্পিক প্রতিকৃতি।
পারফরম্যান্স আর্ট এবং বিশেষ মুহূর্ত
ম্যাডোনা যেন কার্পেটকে তার নিজের মঞ্চে পরিণত করেছিলেন। একদল নারী তাকে ঘিরে ছিল এবং তাদের হাতে থাকা স্বচ্ছ কাপড় ম্যাডোনার মাথার ওপর থাকা জলদস্যু জাহাজের মতো হেডপিসের সাথে যুক্ত ছিল। এটি ছিল এক ধরনের চলন্ত শিল্পকলা।
জানেল মোনে তার পোশাকের মাধ্যমে প্রকৃতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তার পোশাকে ছিল তারের জঞ্জাল এবং শ্যাওলার আবরণ। তিনি এপি-কে বলেন, প্রকৃতি আমাদের সাথে কথা বলছে, আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে মানুষ হওয়ার প্রকৃত অর্থ।
অন্যদিকে, কেটি পেরি এবং গোয়েন্ডোলিন ক্রিস্টি তাদের মাস্ক বা মুখোশ নিয়ে কার্পেটে লুকোচুরি খেলেছেন। ক্রিস্টি নিজের মুখেরই একটি মাস্ক দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন, যা ছিল বেশ কৌতুকপূর্ণ।
কার্পেটের সাজসজ্জা
গত বছরের নীল কার্পেটের বিপরীতে এবারের মেট গালার কার্পেট ছিল প্রাকৃতিক এবং কালজয়ী। মিউজিয়ামের সিঁড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে জ্যান্ত ঘাস বেরিয়ে আসছিল, যেন প্রকৃতি ধীরে ধীরে স্থাপনাটিকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
সিঁড়ির দুই পাশে ছিল ঝোপঝাড় এবং ছাদ থেকে ঝুলছিল সাদা উইস্টেরিয়া ফুল। প্রবেশপথে মাটির পাত্রে রাখা বেগুনি ফুলগুলো পুরো পরিবেশকে একটি প্রাচীন বাগান বা গ্রিক আর্ট গ্যালারির রূপ দিয়েছিল।
২০২৬ সালের মেট গালা প্রমাণ করে দিল যে ফ্যাশন কেবল পরিধানযোগ্য বস্ত্র নয়, এটি চিন্তার খোরাক এবং প্রতিবাদের ভাষাও হতে পারে।
কস্টিউম ইনস্টিটিউটের ‘কস্টিউম আর্ট ‘প্রদর্শনীর এই উদ্বোধনী রাতটি ইতিহাসের পাতায় ফ্যাশন এবং শিল্পের এক মিলনমেলা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রতিটি পোশাকই ছিল এক একটি গল্প, যা আমাদের শরীরের সৌন্দর্য এবং মানুষের সৃজনশীলতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
এএন