ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালের আলোচিত মডেল ত্বিষা শর্মা, মৃত্যুরহস্যে এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক মোড় এসেছে। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ত্বিষা যে বিউটি পার্লারে গিয়েছিলেন, সেই পার্লারের মালিক এবার সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলেছেন।
পার্লার মালিকের দাবি, ত্বিষার মৃত্যুর পরদিনই তার শাশুড়ি তথা অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গিরিবালা সিং পার্লারের সিসিটিভি, ফুটেজ এবং পেমেন্ট রেকর্ডের জন্য নজিরবিহীন তাড়াহুড়ো ও চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। এমনকি পুলিশের নাম করে একদল অজ্ঞাতপরিচয় আইনজীবীও পার্লারে এসে জোরপূর্বক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।
যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং মানসিক হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত এই পরিবারটির এমন রহস্যজনক আচরণ মডেল ত্বিষার মৃত্যুকে ঘিরে সন্দেহের তীর আরও ঘনীভূত করেছে।
সিসিটিভি ফুটেজ ও পার্লার মালিকের এক্সক্লুসিভ বক্তব্য
গত ১২ মে ভোপালে নিজের শ্বশুরবাড়িতে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় নয়ডার বাসিন্দা ও জনপ্রিয় মডেল ত্বিষা শর্মাকে। তদন্তে জানা যায়, মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে দুপুর ৩টা ১২ মিনিটে তিনি স্থানীয় একটি নামী বিউটি পার্লারে গিয়েছিলেন।
এনডিটিভিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে পার্লারের মালিক কিরণ পরিহার ঘটনার দিনের বিবরণ দিয়ে জানান, ত্বিষা সেদিন প্রায় তিন ঘণ্টা পার্লারে সময় কাটান। সেখানে তিনি হেড মেসেজ, এবং পেডিকিউর করান। সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ১৫ মিনিটে তিনি পার্লার থেকে বের হয়ে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যান। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই তার আত্মহত্যার খবর সামনে আসে।
পার্লার মালিক কিরণ পরিহার আরও জানান, ত্বিষা ওই পার্লারের নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন এবং এর আগেও চার-পাঁচবার এসেছেন। তবে গত ৯ মাস তিনি পার্লারে আসেননি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ভাইয়ের বিয়ের জন্য তিনি একটি প্রিপেইড পার্লার প্যাকেজ কিনেছিলেন। সেই প্যাকেজের আওতায় থাকায় ১২ মে-র ভিজিটের পর ত্বিষাকে নতুন করে কোনো টাকা বা পেমেন্ট করতে হয়নি।
শাশুড়ির বারবার ফোন এবং সিসিটিভি ফুটেজের জন্য আকুতি
কিরণ পরিহারের দাবি অনুযায়ী, ত্বিষার মৃত্যুর পরের দিন অর্থাৎ ১৩ মে সকাল থেকেই ত্বিষার শাশুড়ি গিরিবালা সিং (যিনি নিজেও ওই পার্লারের একজন নিয়মিত গ্রাহক এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক) পার্লারে ফোন করা শুরু করেন। গিরিবালা সিং ফোন করে ত্বিষার আগের দিনের পার্লার সফর নিয়ে একাধিক নিখুঁত ও খুঁটিনাটি তথ্য জানতে চান।
গিরিবালা সিং জানতে চান, ত্বিষা ঠিক কখন পার্লারে এসেছিলেন এবং কখন বের হয়ে গেছেন?, পার্লার থেকে বের হওয়ার সময় তার আচরণ কেমন ছিল?, তিনি পার্লারের বিল কীভাবে পরিশোধ করেছেন? ক্যাশ, নাকি অনলাইন পেমেন্ট?, ত্বিষা যে পার্লারে এসেছিলেন, তার কি কোনো লিখিত প্রমাণ বা পেমেন্ট রিসিট পার্লারের রেকর্ডে আছে?
পার্লার মালিক তাকে জানান যে, প্রিপেইড প্যাকেজ থাকায় ত্বিষা কোনো পেমেন্ট বা লেনদেন করেননি। এর কিছুক্ষণ পর বিকেলের দিকে গিরিবালা সিং আবারও ফোন করেন এবং পার্লারের সিসিটিভি ফুটেজ দাবি করেন। গিরিবালা সিংয়ের এমন উদ্বিগ্নতা দেখে কিরণ পরিহার যখন জানতে চান যে ত্বিষা ঠিক আছেন কি না, তখন গিরিবালা ঠান্ডা মাথায় জানান যে ত্বিষা আত্মহত্যা করেছেন।
'আইনজীবী' সেজে পার্লারে রহস্যময় দলের হানা
শাশুড়ির ফোনের কিছুক্ষণের মধ্যেই পার্লারে এক চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিরণ পরিহার জানান, কালো ও সাদা রঙের কোট-প্যান্ট পরিহিত (আইনজীবীদের পোশাক) ৫ থেকে ৬ জনের একটি দল আকস্মিকভাবে পার্লারে এসে হাজির হয়। তাদের মধ্যে একজন নারী নিজেকে আইনজীবী বা অ্যাডভোকেট হিসেবে পরিচয় দেন।
তারা দাবি করেন যে, ত্বিষা শর্মার আত্মহত্যার মামলার তদন্তের স্বার্থে পুলিশের এই সিসিটিভি ফুটেজ জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। পার্লার কর্তৃপক্ষ কোনো ঝামেলায় না জড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সিসিটিভি টেকনিশিয়ানকে ডেকে এনে তাদের সামনেই ফুটেজটি কপি করে দেয়।
তবে সবচেয়ে বড় রহস্যের বিষয় হলো, পুলিশের কথা বলে ফুটেজ নিয়ে যাওয়া ওই ৫-৬ জন ব্যক্তি আসলে কারা ছিলেন, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ত্বিষার পরিবারের অভিযোগ, গিরিবালা সিং নিজে আইন পেশার সাথে জড়িত (অবসরপ্রাপ্ত বিচারক) থাকায় নিজের প্রভাব খাটিয়ে আদালত ও পুলিশের আগেই প্রমাণ লোপাট বা কারচুপির উদ্দেশ্যে তার পরিচিত আইনজীবীদের পাঠিয়ে ওই ফুটেজ হাতিয়ে নিয়েছেন।
যৌতুকের দাবি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ
নয়ডার মেয়ে ত্বিষা শর্মার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই স্বামী সমর্থ সিং , এবং শাশুড়ি গিরিবালা সিং মোটা অঙ্কের যৌতুকের দাবিতে ত্বিষার ওপর চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। এই ধারাবাহিক মানসিক হেনস্তার কারণেই ত্বিষা আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বিখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী শোভা দে , এই মামলা প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে ত্বিষার শাশুড়ি গিরিবালা সিংকে ,আইনি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এক অপরাধী মনস্তত্ত্বের মানুষ, বলে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। ত্বিষার পরিবারের দাবি, একজন প্রাক্তন বিচারক হওয়ায় গিরিবালা খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে আইনের ফাঁক গলে বের হওয়া যায় এবং প্রমাণ নষ্ট করা যায়। এমনকি আদালতে অভিযুক্ত স্বামী সমর্থ সিংকে 'ভিআইপি ট্রিটমেন্ট' বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও নিহতের পরিবার অভিযোগ তুলেছে।
পুলিশের দাবি ও দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের নির্দেশ
ভোপাল পুলিশের প্রাথমিক দাবি, ময়নাতদন্তের , রিপোর্ট এবং প্রাথমিক পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনাই মনে হচ্ছে। তবে ত্বিষার পরিবার এই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, এটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডও হতে পারে।
পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট , ত্বিষার মরদেহের পুনরায় বা দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত , করার অনুমোদন দিয়েছে, যা এই মামলার সত্য উদঘাটনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
১০ দিন পলাতক থাকার পর স্বামী গ্রেপ্তার
ত্বিষার মৃত্যুর পর থেকেই তার স্বামী সমর্থ সিং পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১০ দিন পলাতক থাকার পর অবশেষে গতকাল (২২ মে) পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। আজ তাকে ভোপালের স্থানীয় আদালতে হাজির করা হবে। সমর্থ সিংয়ের আইনজীবীর দাবি, তার মক্কেল কোথাও পালিয়ে যাননি, বরং আইনি পরামর্শ নিচ্ছিলেন। তবে পুলিশের দাবি, সমর্থ সিংকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মৃত্যুর আসল কারণ এবং সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করার চেষ্টার পেছনের রহস্য উন্মোচিত হবে।
মডেল ত্বিষা শর্মার এই রহস্যমৃত্যু এবং প্রভাবশালী শ্বশুরবাড়ির সন্দেহভাজন তৎপরতা বর্তমানে ভারতের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর শীর্ষ শিরোনামে রয়েছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
এএন