বলিউড অভিনেতা রণবীর সিংহ এবং ফেডারেশন অব ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমা এমপ্লয়িজ (FWICE)-এর মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ্ব এবার এক নতুন মোড় নিল। আইনি নোটিশ এবং চলচ্চিত্র জগতের অন্যান্য সংগঠনের চাপের মুখে পড়ে অবশেষে রণবীর সিংহের বিরুদ্ধে জারি করা ‘অসহযোগিতা’ সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রত্যাহার করে নিল সিনে কর্মচারীদের এই শীর্ষ সংগঠন।
বুধবার মুম্বইয়ে আয়োজিত এক জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে নির্দেশিকা প্রত্যাহার করা হলেও ব্লকবাস্টার ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘ডন ৩’ (Don 3) থেকে রণবীরের আকস্মিক প্রস্থান এবং তার ফলে প্রযোজকদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির বিতর্ক বলিউডকে দুই শিবিরে বিভক্ত করে ফেলেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত গত বছর ডিসেম্বর মাসে রণবীর সিংহ অভিনীত ‘ধুরন্ধর’ ছবিটি মুক্তির পর। ফারহান আখতার পরিচালিত বহু প্রতীক্ষিত অ্যাকশন থ্রিলার ছবি ‘ডন ৩’-এ প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন রণবীর। কিন্তু ছবির কাজ শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, একেবারে শেষ সময়ে (Eleventh Hour) রণবীর সিংহ এই প্রজেক্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।
রণবীরের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে ছবিটির প্রযোজনা সংস্থা ‘এক্সেল এন্টারটেইনমেন্ট’ চরম বিপাকে পড়ে। প্রি-প্রোডাকশনের সমস্ত খরচ এবং অন্যান্য টেকনিশিয়ানদের শিডিউল নষ্ট হওয়ায় কোটি কোটি টাকার আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হতে হয় তাদের।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ২৫ মে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে রণবীর সিংহের বিরুদ্ধে ‘অসহযোগিতা’র ফতোয়া জারি করে ফেডারেশন (FWICE)। এর অর্থ ছিল, ফেডারেশনের আওতাভুক্ত কোনো টেকনিশিয়ান, দিনমজুর বা কর্মী রণবীরের কোনো শুটিংয়ে অংশ নেবেন না- যা কার্যত এক ধরনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞার বা 'ব্যান' সমান।
ফেডারেশনের এই একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চুপ করে থাকেননি রণবীর সিংহ। গতকালই তিনি তার আইনজীবী মারফত FWICE-কে একটি কড়া আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশে স্পষ্ট জানানো হয়, কোনো ট্রেড ইউনিয়ন বা সংগঠনের এককভাবে কোনো শিল্পীর কর্মসংস্থানের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বা তার বিরুদ্ধে অসহযোগিতার নির্দেশ জারি করার কোনো আইনি এক্তিয়ার নেই।
এই আইনি নোটিশ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সুর নরম করতে বাধ্য হয় ফেডারেশন। আজ বুধবার মুম্বইয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে 'এফ ডব্লিউ আই সি ই-এর সভাপতি বি এন তিওয়ারি জানান যে, ‘সিন্টা’ ' এবং ‘ইম্পা’ এর বিশেষ অনুরোধে তারা রণবীরের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে ফেডারেশনের প্রধান উপদেষ্টা তথা চলচ্চিত্র নির্মাতা অশোক পণ্ডিত বলেন, গতকালই আমাদের কাছে রণবীর সিংহের আইনি চিঠি এসেছে, যেখানে অসহযোগিতার নির্দেশিকাটি তুলে নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। আমাদের লিগ্যাল টিম এই নোটিশের আনুষ্ঠানিক জবাব দেবে।
তবে আমরা রণবীরকে আহ্বান জানাচ্ছি, তিনি যেন আমাদের সাথে এসে বসুন এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সমাধান সূত্র বের করেন। আমরা অভিনেতার তারকাখ্যাতিকে সম্মান করি। কাউকে নিষিদ্ধ করার কোনো আইনি ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা আশাবাদী রণবীরের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাব।
ফেডারেশন নিজেদের মুখে ‘নিষিদ্ধ’ করার ক্ষমতার কথা অস্বীকার করলেও, বলিউডে এর আগেও বিভিন্ন সময় এই ধরনের ফতোয়া দিয়ে শিল্পীদের কাজ বন্ধ করার নজির রয়েছে। এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বলিউডের প্রবীণ চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং ‘ইম্পা -র প্রাক্তন সভাপতি টি পি আগরওয়াল।
আগরওয়াল বোম্বে সিভিল কোর্টে (ডিন্ডোশি) এবং উভয় সংগঠনের বিরুদ্ধেই একটি পিটিশন দাখিল করেছেন। তার মামলার মূল যুক্তি হলো ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ট্রেড বডির এমন কোনো আইনি এক্তিয়ার নেই যা কোনো নির্দিষ্ট শিল্পীর সাথে অন্যদের কাজ করতে বাধা দিতে পারে।
এই ধরনের নির্দেশিকা বা ফতোয়া সম্পূর্ণ বেআইনি এবং ভারতীয় শ্রম আইন ও মুক্ত ব্যবসার পরিপন্থী। অশোক পণ্ডিত জানিয়েছেন, ফেডারেশনের আইনজীবীরা টি পি আগরওয়ালের এই মামলারও আইনি উপায়ে জবাব দেবেন।
ফেডারেশন রণবীরের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও বলিউডের প্রযোজক মহল কিন্তু এই 'শেষ মুহূর্তের চুক্তিভঙ্গ' বা ব্যাক-আউট করার প্রবণতায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ঠিক আগেই ‘প্রডিউসার্স গিল্ড অব ইন্ডিয়া’ একটি কড়া বিবৃতি জারি করেছে।
বিবৃতিতে রণবীর সিংহের নাম সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও, ‘ডন ৩’ (এক্সেল এন্টারটেইনমেন্ট) এবং অক্ষয় খন্নার ‘দৃশ্যম ৩’ - প্যানোরামা স্টুডিওজ ইন্টারন্যাশনাল) থেকে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গ টেনে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
প্রডিউসার্স গিল্ডের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বড় তারকা, পরিচালক এবং টেকনিশিয়ানদের শেষ মুহূর্তে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটার ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ইন্ডাস্ট্রি বা বিনোদন জগতের কোনো সদস্যেরই এমন আচরণ করা উচিত নয় যা প্রযোজকদের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত অন্যান্য বিভাগেরও বিপুল আর্থিক ক্ষতিসাধন করে। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ চলচ্চিত্র শিল্পের মূল ভিত্তি- বিশ্বাস, পেশাদারিত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে।
রণবীর বনাম ফেডারেশনের এই লড়াইয়ে গোটা বলিউড এখন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। কঙ্গনা রানাউত, রামগোপাল বর্মা, পদ্মিনী কোলহাপুরে, পুনম ধিলোঁ, সঞ্জয় গুপ্তা এবং নিখিল দ্বিবেদীর মতো তারকারা ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন।
জনপ্রিয় প্রযোজক নিখিল দ্বিবেদী সরাসরি রণবীরের পক্ষে সওয়াল করে বলেছেন, কারো জীবিকা এভাবে বন্ধ করে দেওয়া যায় না। কোনো সংগঠন কোনো অভিনেতাকে কাজ করতে বাধ্য করতে পারে না।
অন্যদিকে কঙ্গনা রানাউত অতীতে কীভাবে জন আব্রাহাম নিজের ছবির স্বত্ব কোনো ঝামেলা ছাড়াই বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছিলেন, সেই উদাহরণ টেনে ইন্ডাস্ট্রিতে নৈতিকতার গুরুত্ব মনে করিয়ে দিয়েছেন।
এর মাঝেই সুস্মিতা সেনের ললিত মোদী সংক্রান্ত পুরনো বিতর্ক এবং লেডি গাগার ব্রোঞ্জার লঞ্চের খবরও বিনোদন দুনিয়ায় শোরগোল ফেলেছে, তবে রণবীরের এই সংঘাতই এখন টক অব দ্য টাউন।
ফেডারেশন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় আইনি দিক থেকে রণবীর সিংহের ‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজির পরবর্তী পার্ট বা অন্যান্য নতুন ছবির শুটিংয়ে আর কোনো বাধা রইল না। তবে এই ঘটনার পর বলিউডের অন্দরে এথিকস বা চুক্তিভিত্তিক নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। হলিউডের আদলে বলিউডেও চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে কড়া পেনাল্টি বা আর্থিক জরিমানার নিয়ম চালু করার দাবি তুলছেন প্রযোজকরা।
এখন দেখার বিষয়, ফেডারেশনের আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান গ্রহণ করে রণবীর সিংহ ফারহান আখতার ও এক্সেল এন্টারটেইনমেন্টের সাথে মনমালিন্য মিটিয়ে নেন কিনা, নাকি এই আইনি লড়াই আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
এএন