বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাবে শরীরে যেসব ক্ষতি হতে পারে

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ১১:১২ এএম

সম্প্রতি পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ উদ্বেগজনক তথ্য। ইএসডিওর গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করে দেখা যায়, এর মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। 

শিশুদের জন্য তৈরি কয়েকটি টুথপেস্টেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় অল্প পরিমাণ পেস্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এমনটি ঘটলে তা সেটি হতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ।

মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বিশ্বজুড়েই এখন গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, যকৃত, কিডনি, এমনকি প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। যদিও এগুলো ঠিক কতটা ক্ষতি করে, সে বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে, তবে সম্ভাব্য কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন।

মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। বড় প্লাস্টিক ভেঙে যেমন এসব কণা তৈরি হয়, তেমনি প্রসাধনী, ব্যক্তিগত পরিচর্যার বিভিন্ন পণ্য, পোশাকের সিনথেটিক তন্তু এবং শিল্পকারখানার নানা উপাদান থেকেও এগুলো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন খাবার, পানীয় ও বাতাসের মাধ্যমে অজান্তেই কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমেও এ ধরনের কণার সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত তিনটি উপায়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে—খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমে, বাতাসের সঙ্গে শ্বাস নেওয়ার সময় এবং কিছু প্রসাধনী বা ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে। টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় অল্প পরিমাণ পেস্ট গিলে ফেললে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিপাকতন্ত্রে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।

বিভিন্ন গবেষণায় ইতোমধ্যে মানুষের শরীরের নানা অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো শুধু পরিপাকতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেও পৌঁছাতে সক্ষম। এ কারণে এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিককে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিদেশি বস্তু হিসেবে শনাক্ত করতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। এছাড়া কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তনালিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, তাদের হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক বা অন্যান্য হৃদ্‌সংক্রান্ত জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে গবেষকরা বলছেন, এটি সরাসরি কারণ নাকি কেবল একটি সম্পর্ক—তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক গবেষণায় মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারের কিছু প্লাস্টিক কণা রক্ত ও মস্তিষ্কের সুরক্ষাব্যবস্থা অতিক্রম করতে পারে। তবে স্মৃতিশক্তি বা স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, অনেক প্লাস্টিকে এমন রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। দীর্ঘদিন এসব উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে বিপাকক্রিয়া, প্রজননস্বাস্থ্য এবং হরমোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করতে পারে, যা কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে কোষের ক্ষতির কারণও হতে পারে। তবে মানুষের শরীরে বাস্তব পরিস্থিতিতে এর প্রভাব কতটা, তা এখনো গবেষণাধীন।

বাতাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক ফুসফুসে জমে শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ বা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও গবেষকদের ধারণা। তবে এ সম্পর্কেও আরও বৈজ্ঞানিক তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলছেন, মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হলেও এগুলো কোন মাত্রায় ক্ষতিকর হয়ে ওঠে বা কত পরিমাণে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য তৈরি হয়নি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এ বিষয়ে গবেষণা দ্রুত এগোলেও বহু প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। একই ধরনের পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে বিবিসি ফিউচারও। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা বর্তমানে সম্ভব না হলেও কিছু সতর্কতা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা অপ্রয়োজনীয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কম ব্যবহার, কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করছেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্লাস্টিকে মোড়ানো খাবার এড়িয়ে চলা, ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত পরিষ্কার করা, শিশুদের টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় তদারকি করা এবং বিশ্বস্ত ও মানসম্মত ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কয়েকটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে সচেতন থাকা এবং নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নতুন তথ্য ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ।

সূত্র: বিবিসি, স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন

এএন