যুদ্ধবিরতির পথে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্বস্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক  প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধ অবসানের পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, উভয় দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবারও পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হবে। একই সঙ্গে ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধও তুলে নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। চুক্তির খবর প্রকাশের পরপরই অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি বিশ্বে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই নৌপথে অস্থিরতা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছিল।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সমঝোতা

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, দীর্ঘ আলোচনার পর দুই পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সমঝোতার আওতায় সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে সাম্প্রতিক সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, চুক্তিটি কার্যকর হলে প্রথম ধাপে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা পর্ব শুরু হবে। এই সময়ে আরও জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন।

তেহরানে বিজয়ের বার্তা

ইরানের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক মহলে এই সমঝোতাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন মহল দাবি করছে, দীর্ঘ চাপ ও সামরিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করা হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, তারা এই চুক্তিকে নিজেদের অবস্থানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তারা আশা করছেন, ভবিষ্যৎ আলোচনায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পথ তৈরি হবে।

লেবানন প্রশ্নে জটিলতা রয়ে গেছে

চুক্তিতে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা উল্লেখ থাকলেও এ বিষয়ে এখনো পুরোপুরি ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে না। লেবাননের কর্তৃপক্ষ সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তাজনিত কারণে লেবাননে তাদের সেনা উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে পারে।

এই অবস্থান ভবিষ্যতে নতুন উত্তেজনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, যুদ্ধবিরতি সফল করতে হলে আঞ্চলিক সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা

যদিও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, ভবিষ্যৎ পরমাণু কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক তদারকির বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন সূত্র বলছে, আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া

চুক্তির ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। তেলের দাম কমেছে এবং শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে গেলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসবে।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়া শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে সম্ভাব্য স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দিকে এখন নজর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, এটি এখনো একটি প্রাথমিক সমঝোতা। যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে অগ্রগতি হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো সমাধানের অপেক্ষায়।

তবু কয়েক মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের আলোচনা নির্ধারণ করবে, এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তির পথে রূপ নেয় কি না।

এএন