ট্রাম্পের ইরান চুক্তিতে চাপে নেতানিয়াহু, নির্বাচনের আগে কঠিন সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ১২:২৮ এএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের নতুন কূটনৈতিক সমঝোতা সেই সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র চাপের মুখে পড়েছেন নেতানিয়াহু।

জনপ্রিয়তায় ধস ও অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা: ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের সিংহভাগ মানুষ ও রাজনৈতিক মহল ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ইরান চুক্তির বিরোধিতা করছে। এর ফলে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। আগামী অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে হোয়াইট হাউসের সাহায্য নিয়ে জয়ী হওয়ার যে পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন, তা এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইসরায়েলিদের মতে, এই চুক্তিতে ইরানের ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ কাঠামো প্রায় অক্ষত থেকে যাচ্ছে, যা দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এমনকি একসময়ের কট্টর সমর্থক ইয়িনন মাগালের মতে, “ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পিঠে ছুরি মেরেছেন।”

নেতানিয়াহু-ট্রাম্প সম্পর্কের টানাপোড়েন: সাম্প্রতিক ফোনালাপ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দুই নেতার সম্পর্কের তিক্ততা প্রকাশ পেয়েছে। টাইমস অফ ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘কঠিন লোক’ অভিহিত করে কড়া ভাষায় তিরস্কার করেছেন এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আমেরিকার সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকতে পারত না। এছাড়া জি-৭ সম্মেলন এবং কাতারের আমিরের সঙ্গে বৈঠকেও ট্রাম্প ইসরায়েলের লেবানন ও হিজবুল্লাহ নীতির ওপর বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

নিরাপত্তা ও কৌশলগত সংকট: হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, এই চুক্তির ফলে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। তবে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন গভির এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে জানিয়েছেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ নয় এবং এই চুক্তি মানতে তারা বাধ্য নয়। অন্যদিকে, বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিদ সরাসরি নেতানিয়াহুকে দায়ী করে বলেছেন, তিনি ওয়াশিংটনের ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে ইসরায়েলকে একটি ‘পরাধীন রাষ্ট্রে’ পরিণত করছেন।

লেবানন ও হিজবুল্লাহ ইস্যু: ট্রাম্প দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের জন্য বারবার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে ইসরায়েলের অধিকাংশ মানুষ হিজবুল্লাহকে অস্তিত্বের সংকট মনে করে। ট্রাম্পের নির্দেশে নেতানিয়াহু যদি পিছু হটেন, তবে দেশের ভেতরে তাকে চরম সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সেনা প্রত্যাহার বাধ্যতামূলক না হলেও হিজবুল্লাহর সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন।

ব্যক্তিগত ও আইনি চ্যালেঞ্জ: রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও চাপে আছেন ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু। তিনি প্রোস্টেট ক্যানসার ও হৃদরোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর পাশাপাশি দুর্নীতির মামলার বিচারিক কার্যক্রমে প্রতি সপ্তাহে তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জরিপ বলছে, ৬১ শতাংশ মানুষ চান না তিনি আর নির্বাচনে দাঁড়ান।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ইরান চুক্তি এবং ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত নীতি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অক্টোবরের নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পাওয়া এখন তাঁর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।