বার্নহ্যামকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে আটকাতে লেবার এমপিদের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের ভাবনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০১:২২ পিএম

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল আলোড়ন তৈরি হয়েছে। লেবার পার্টির নতুন নেতা এবং দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যাতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে না পারেন, সে জন্য দলের অন্তত দুজন সংসদ সদস্য বা এমপি নেতৃত্বের দৌড়ে অংশ নেওয়ার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন।

গতকালই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার আকস্মিক এক ঘোষণায় নিজের পদত্যাগের কথা জানান। স্টারমারের এই নাটকীয় প্রস্থানের পর মেকারফিল্ডের নবনির্বাচিত এমপি অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দলের শীর্ষ পদের পাশাপাশি দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।

তবে দলের ভেতরে সবার মাঝে একচ্ছত্রভাবে তাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা নেই। দলের একটি অংশ মনে করছে, দেশের এই সর্বোচ্চ পদের জন্য একটি গণতান্ত্রিক এবং উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়া জরুরি। আর সেই লক্ষ্যেই এখন নতুন চ্যালেঞ্জারদের নাম সামনে আসছে।

মূল ঘটনা ও চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা বিবিসির রাজনৈতিক সংবাদদাতা হেনরি জেফম্যানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেবার পার্টির এমপি আল কার্নস এবং ড্যারেন জোন্স দলের নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জন্য ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের পথ যেন একেবারে মসৃণ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন না হয়। তারা চান দলের আদর্শ, নীতি এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে একটি সুস্থ বিতর্ক ও প্রতিযোগিতা হোক।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহ্যামের বিরুদ্ধে এই দুই এমপির চ্যালেঞ্জ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।

আল কার্নস, তিনি নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামার ব্যাপারে বেশ জোরালোভাবে চিন্তা করছেন এবং দলের একটি নির্দিষ্ট অংশের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে ড্যারেন জোন্স, জোন্সের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা কিছুটা কম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তিনি এখন পর্যন্ত এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।

বর্তমান সংসদীয় পার্টি বা লেবার এমপিদের মাঝে বার্নহ্যামের যে শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে, তাতে কার্নস বা জোন্স প্রয়োজনীয় সংখ্যক এমপির সমর্থন সংগ্রহ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী,  নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে নির্দিষ্ট সংখ্যক এমপিদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন বা নমিনেশন প্রয়োজন হয়।

বর্তমান সমীকরণে বার্নহ্যামের পাল্লাই ভারী। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আগামী ৯ জুলাই যখন মনোনয়ন পর্ব শুরু হবে, তখন পর্যন্ত অনেক সমীকরণই বদলে যেতে পারে। ব্রিটিশ রাজনীতিতে কয়েক দিনও একটি দীর্ঘ সময়, যেখানে রাতারাতি দৃশ্যপট পরিবর্তন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

দলের ভেতরের সমীকরণ ও বার্নহ্যামের অবস্থান: লেবার পার্টির ভেতরে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রভাব বেশ জোরালো। বিশেষ করে গত সোমবার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের একটি ঘোষণা বার্নহ্যামের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। ওয়েস স্ট্রিটিংকে দলের অনেকেই সম্ভাব্য নেতৃত্বের দাবিদার বা একজন শক্তিশালী চ্যালেঞ্জার হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্ট্রিটিং স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি নিজে প্রার্থী হচ্ছেন না, বরং তিনি অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন।

স্ট্রিটিংয়ের মতো একজন প্রভাবশালী নেতার সমর্থন পাওয়ার পর বার্নহ্যামের পথ অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলের একটি বড় অংশ মনে করছে, এই মুহূর্তে দলে কোনো বিভাজন না তৈরি করে একজন শক্তিশালী নেতার পেছনে সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত।

কিন্তু এর বিপরীতে আল কার্নস ও ড্যারেন জোন্সের মতো এমপিরা মনে করেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করাটা দল ও দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক নয়।

নেতৃত্ব নির্বাচনের সময়সূচি ও পরবর্তী ধাপ: লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী কমিটি ইতিমধ্যেই নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করেছে। এই সময়সূচি অনুযায়ী পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো নির্ধারিত হবে।

প্রথম ধাপে ৯ জুলাই লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পর্ব শুরু হবে। আগ্রহীরা এই দিন থেকে সমর্থন সংগ্রহ শুরু করতে পারবেন।

দ্বিতীয় ধাপে ১৬ জুলাই মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময়। এই দিনের মধ্যে প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় সংখ্যক এমপির স্বাক্ষরসহ সমর্থন প্রমাণ করতে হবে।

চূড়ান্ত ধাপে ১৭ জুলাই যদি ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের বিরুদ্ধে কোনো বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়াতে না পারেন, তবে ১৭ জুলাইয়ের মধ্যেই তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লেবার পার্টির নেতা এবং যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষিত হতে পারেন।

কিয়ার স্টারমারের আকস্মিক পদত্যাগের পর যুক্তরাজ্যের শাসনক্ষমতায় যাতে কোনো শূন্যতা বা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি না হয়, সেটি নিশ্চিত করা লেবার পার্টির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অ্যান্ডি বার্নহ্যাম অতীতে ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নিজের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। ফলে দলের সাধারণ কর্মী ও জনগণের একটি বড় অংশের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

তবে দলের ভেতরের ভিন্নমতাবলম্বীদের যুক্তি হলো, কোনো রকম প্রতিযোগিতা ছাড়া সরাসরি প্রধানমন্ত্রী পদে বসালে নেতার ওপর এক ধরনের একনায়কতান্ত্রিক বা জবাবদিহিহীন পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

আল কার্নস এবং ড্যারেন জোন্স যদি শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করে মনোনয়ন জমা দিতে পারেন, তবে লেবার পার্টিকে একটি অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল এমপিদের ভোটে নয়, बल्कि বা বরং দলের সাধারণ সদস্যদের ভোটেও গড়াতে পারে।

আর যদি তারা ব্যর্থ হন, তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়েই অ্যান্ডি বার্নহ্যামের হাত ধরে যুক্তরাজ্য এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। আগামী দিনগুলোতে লেবার এমপিদের মধ্যকার এই গোপন ও প্রকাশ্য আলোচনা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

জেএইচআর