অভিযোগ অরুণাচলের আদিবাসীদের

ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছে চীনা সেনাবাহিনী, দখলে নিয়েছে বিস্তৃত এলাকা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) কয়েক কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করেছে- এমন অভিযোগ তুলেছে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের একটি আদিবাসী সংগঠন। তাদের দাবি, শুধু অনুপ্রবেশই নয়, চীনা বাহিনী সেখানে সামরিক স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি স্থানীয়দের কৃষিকাজ ও পশুচারণেও বাধা দিচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী ‘নাহ’ আদিবাসীদের সংগঠন ‘নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ এ অভিযোগ সামনে এনেছে। সংগঠনটির দাবি, গত কয়েক বছর ধরে চীনা সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে ওই এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের পূর্বপুরুষদের ব্যবহৃত কৃষিজমি, চারণভূমি এবং বনাঞ্চলে আর প্রবেশ করতে পারছেন না।

অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশে চীনা বাহিনীর অনুপ্রবেশ ও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো সঠিক নয় এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সভাপতি কেরু চাদের বলেন, যেসব ভূমিতে তাদের পূর্বপুরুষরা দীর্ঘদিন ধরে শিকার, চাষাবাদ ও গবাদিপশু চরানোর কাজ করেছেন, সেসব এলাকা এখন কার্যত চীনা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তার অভিযোগ, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) সংলগ্ন আপার সুবনসিরি জেলার অন্তত পাঁচটি স্থানে পিএলএ স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেছে এবং স্থানীয়দের সেখানে যেতে বাধা দিচ্ছে।

কেরু চাদের আরও জানান, প্রায় ১২ বছর আগে মাঝে মধ্যে চীনা সেনারা ওই এলাকায় প্রবেশ করলেও ২০২০ সালের পর থেকে তারা স্থায়ীভাবে অবস্থান নিতে শুরু করে। এরপর থেকেই স্থানীয়দের ওই এলাকাগুলোতে যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আসাফিলা এলাকার ওয়িং ও পানিয়ার (চুজার্তা), মারপান (মারনাফে), পোত্রাং হ্রদ এবং টিনডিংতাং (টিজি) এলাকায় এ ধরনের দখলদারির ঘটনা ঘটেছে। এসব স্থান তাকসিং সদর দপ্তরের কাছাকাছি অবস্থিত এবং কয়েকটি এলাকাকে স্থানীয় জনগণ ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবেও বিবেচনা করে।

এর আগে লাদাখ সীমান্তেও চীনা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ এবং স্থানীয় পশুপালকদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। যদিও সে সময়ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করেছিল, দেশটির এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও চীনের দখলে যায়নি।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আপার সুবনসিরি জেলার ডেপুটি কমিশনারের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, যেসব এলাকায় স্থানীয়রা একসময় অবাধে বনজ সম্পদ সংগ্রহ, শিকার এবং পশুচারণ করতেন, সেগুলো বর্তমানে চীনা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, তাকসিং রাজস্ব সার্কেলের আওতাধীন অন্তত পাঁচটি এলাকায় চীন ধাপে ধাপে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো কৌশলগতভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

নাচো এলাকার বিধায়ক নাকাপ নালো বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত উল্লেখ করে বলেছেন, অভিযোগগুলো যথাযথভাবে প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্ত ও যাচাই করা প্রয়োজন। তার মতে, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয় এবং স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ।

স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে তাকসিং সীমান্ত এলাকায় চীনা সেনাবাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, চীনের মূল লক্ষ্য সীমান্তবর্তী যত বেশি সম্ভব এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। পাশাপাশি ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে সামরিক ক্যাম্প ও সড়ক নির্মাণের অভিযোগও করা হয়েছে।

কেরু চাদের বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন। তার দাবি, তাকসিং এলাকায় চীনা বাহিনীর কার্যক্রমের গতি ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং স্থানীয়দের মতে, প্রতিনিয়ত অল্প অল্প করে তাদের ভূমি হারিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আপার সুবনসিরি জেলা প্রশাসন কিংবা অরুণাচল প্রদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সূত্র: এনডিটিভি

এএন