যেভাবে ইসরায়েলের ফাঁদে পা দিলেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ১২:১৮ এএম

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে গোপন আঁতাতের প্রমাণ মিলেছে। এর জেরে এখন তাঁকে গৃহবন্দি করে রেখেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ভয়ংকর এক পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশ্যে এনেছে।

সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে আহমেদিনেজাদকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়েছে ইসরায়েল। এমনকি তাঁর শাসনামলের পর তাঁকে ইরানপন্থি এক পুতুল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দীর্ঘমেয়াদি ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে হাঙ্গেরীর রাজধানী বুদাপেস্টের লুদোভিকা ইউনিভার্সিটির রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি হাঙ্গেরি সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে অদ্ভুত এক অনুরোধ পান। ওই কর্মকর্তা সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি সম্মেলনের আড়ালে আহমেদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর আহ্বান জানান। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হাঙ্গেরির রাজধানীতে আহমেদিনেজাদের সঙ্গে মোসাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা।

অভিজ্ঞ গোয়েন্দারা জানান, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আহমেদিনেজাদের বুদাপেস্ট সফর ছিল ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। ইসরায়েল মূলত আহমেদিনেজাদকে নিজস্ব ‘সম্পদ’ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যাতে সুযোগ বুঝে বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে তাঁকে ইরানের নতুন শীর্ষ ক্ষমতায় বসানো যায়।

আহমেদিনেজাদকে ঘিরে ইসরায়েলের এই পরিকল্পনা সত্যিই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। কারণ, এই নেতাই তাঁর শাসনামলে (২০০৫-২০১৩) ইরানের পরমাণু কর্মসূচির গতি বাড়িয়েছিলেন, নিয়মিত ইসরায়েলকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন এবং ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা ‘হলোকোস্ট’ অস্বীকার করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর তিনি নিজের কট্টর দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে ফেলেন।

তিনি ইসরায়েল-বিরোধী বক্তব্য বন্ধ করে নিজেকে একজন উদারপন্থী হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। নিজের চিরচেনা ঢিলেঢালা পোশাক ছেড়ে দর্জির কাছে বানানো আধুনিক স্যুট পরা শুরু করেন, বোটক্স চিকিৎসা নেন এবং ইংরেজি শিখতে শুরু করেন। তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর মূলত বর্তমান শাসনব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে তিনি বিদেশি শক্তির সহায়তায় পুনরায় ক্ষমতার শীর্ষে বসার গোপন আকাঙ্ক্ষা লালন করতে শুরু করেন।

মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গোপনে আহমেদিনেজাদের আবাসন ও ভ্রমণ খরচের বড় অংশ জুগিয়েছিল ইসরায়েল। এই গোপন প্রচেষ্টা চূড়ান্ত রূপ নেয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাসভবনের দেহরক্ষী ক্যাম্প ও সাঁজোয়া গাড়িতে আঘাত হানে ইসরায়েলি বিমান।

হামলার পরপরই এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য থেকে মোসাদের এজেন্টরা একটি কালো পিউজো গাড়িতে করে আহমেদিনেজাদকে দ্রুত উদ্ধার করে এক সেফ হাউসে নিয়ে যান। তবে এই হুলস্থুল উদ্ধার অভিযান নিয়ে আহমেদিনেজাদ বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন এবং ইসরায়েলের সহায়তায় পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর মোহভঙ্গ ঘটে।

ইরানের আল কুদস ফোর্স ও আইআরজিসি ২০১৭ সাল থেকেই আহমেদিনেজাদের বিভিন্ন সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালে গুয়াতেমালা সফর এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাঙ্গেরি সফরকালে দেহরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাঁর দীর্ঘ সময়ের জন্য নিখোঁজ থাকার বিষয়টি ইরানি গোয়েন্দাদের মনে দৃঢ় সন্দেহ তৈরি করে। চলতি বছর ইসরায়েলি হামলার পর তদন্তে নেমে ইরানি গোয়েন্দারা মোসাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের অকাট্য সূত্র উদঘাটন করেন।

সেই সেফ হাউস ত্যাগের পর থেকে গত সোমবারের আগ পর্যন্ত আহমেদিনেজাদকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। আজ সোমবার ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তাঁকে দেখা যায়। ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরমের মধ্যেও তিনি ভারী জ্যাকেট এবং সার্জিক্যাল মাস্ক পরে আইআরজিসির কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

জেএইচআর