জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ঢাকার আশুলিয়ায় ৬ জনকে গুলি করে হত্যার পর ভ্যানে করে লাশ স্তূপ করে পুড়িয়ে দেওয়ার সেই লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজ ঘোষণা করেছেন যে, মানবতার বিরুদ্ধে এই জঘন্য অপরাধের মামলার রায় আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) প্রদান করা হবে।
রোববার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক আদেশের দিন ধার্য করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে এবং পরবর্তী সময়ে আশুলিয়া থানা এলাকায় এক নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। সে সময় পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অন্তত ৬ জনকে হত্যা করে। হত্যার পর সেই নিথর দেহগুলো একটি ভ্যানে স্তূপ করে রাখা হয় এবং পরে পেট্রোল ঢেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভ্যানে রাখা লাশের স্তূপের ভিডিও ভাইরাল হলে সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে। একে বর্ণনা করা হয় "জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নৃশংস ঘটনা" হিসেবে।
এই মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ মোট ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং বাকি ৮ জন পলাতক। গ্রেফতার থাকা উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন:
আবদুল্লাহিল কাফী: ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
মো. শহিদুল ইসলাম: সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
মো. আরাফাত হোসেন: ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক পরিদর্শক।
সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই): আবদুল মালেক, আরাফাত উদ্দীন, কামরুল হাসান ও শেখ আবজালুল হক।
মুকুল চোকদার: সাবেক কনস্টেবল।
উল্লেখ্য যে, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ডিবি পরিদর্শক আরাফাত হোসেনকে সেই ভাইরাল ভিডিওতে লাশের স্তূপের পাশে অত্যন্ত সক্রিয় দেখা গিয়েছিল বলে প্রসিকিউশন পক্ষ দাবি করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তি তর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য এই দিন নির্ধারণ করেছেন। প্রসিকিউশন পক্ষের দাবি, এটি কেবল সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর চালানো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
অন্যদিকে, আসামী পক্ষের আইনজীবীরা আত্মপক্ষ সমর্থনে তাদের যুক্তি তুলে ধরেছেন। তবে লাশ পোড়ানোর ভিডিও চিত্র, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এই মামলায় অত্যন্ত শক্তিশালী তথ্যপ্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবার এবং মানবাধিকার কর্মীরা এই রায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই রায় ঘোষণা হতে যাওয়ায় আশুলিয়া ও সাভার এলাকার মানুষের মধ্যে বিশেষ উত্তেজনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি হবে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রায়।
আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি এই মামলার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনা চলছে।
এএন