পুলিশ সংস্কারের উদ্যোগ যতই নেওয়া হোক না কেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাঠামোগত ও কার্যগত সংস্কার না হলে তা টেকসই রূপ পাবে না এমন মত দিয়েছেন প্রশাসন ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এই মন্তব্য করেন তারা।
‘বাংলাদেশ পুলিশের সংস্কার: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনাটি যৌথভাবে আয়োজন করে দৈনিক প্রথম আলো ও বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার কল্যাণ সমিতি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, পুলিশ সংস্কার নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি, কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা ছাড়া এই সংস্কার বাস্তবে সম্ভব নয়। নিয়োগ, বদলি, মামলা ও জামিন সবখানেই রাজনৈতিক প্রভাব গভীরভাবে প্রোথিত।
প্রশাসনের ভেতরে দলীয় প্রভাব ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের সংস্কৃতি এখনো বহাল। ফলে পদোন্নতি বা দায়িত্ব বণ্টন প্রায়ই যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়। কাকে ত্যাগ করা হবে, কাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে সবকিছুতেই রাজনীতির প্রভাব দেখা যায় বলে মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বৈঠকে তিনি পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
মিরপুরের এক ব্যারাকে ২০০ জনের জন্য একটি বাথরুম, ৬০ স্কয়ার ফিটের ঘরে ২০ জন ঘুমায় এই বাস্তবতায় শুধু নতুন পোশাক দিয়ে সংস্কার সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
তার মতে, মাঠপর্যায়ের পুলিশ শুধু ব্যবহারই হয়নি, অনেক সময় তারা নিজেরাও রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার সুযোগ উপভোগ করেছে। তাই কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনও জরুরি।
গোলটেবিলে আরও উপস্থিত ছিলেন, আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম, সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা, অধ্যাপক শাহনাজ হুদা, মানবাধিকারকর্মী নূর খান, ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির সভাপতি এম আকবর আলী।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন তাদের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও তদারকি ব্যবস্থার পুনর্গঠন।
একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের সংস্কার মানে কেবল ইউনিফর্ম পরিবর্তন নয়, বরং নৈতিকতা, মানবাধিকার ও নাগরিক আস্থার পুনর্গঠন।
বক্তারা মত দেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরও প্রশাসনে দলীয় প্রভাব ও পক্ষপাতমূলক নিয়োগের সংস্কৃতি অব্যাহত রয়েছে। এই প্রবণতা বন্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা ও আইনি সংস্কার প্রয়োজন।
অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, আমরা এখনো ‘আমার লোক, তোমার লোক’ মানসিকতার ফাঁদে আটকে আছি। দলগুলোকে এই সংস্কৃতি থেকে বের না করলে কোনো প্রতিষ্ঠানই নিরপেক্ষ হতে পারবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কারের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জ গোয়েন্দা সংস্থার অগণতান্ত্রিক প্রভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ ও বদলি, মানবসম্পদ সংকট ও কর্মপরিবেশের অবনতি, জবাবদিহিহীন মামলা ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া, পুলিশের মানসিক চাপ ও অপ্রাপ্তি।
বৈঠকে বলা হয়, পুলিশ সংস্কার কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়, বরং গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে নাগরিক আস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া।
অংশগ্রহণকারীদের মতে, সংস্কারকে সফল করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনি স্বচ্ছতা ও মানবিক কর্মপরিবেশের সমন্বয় জরুরি।
ইএইচ