ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে তার অনুসারী ও সমমনা আন্দোলনকারীরা।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে জড়ো হয়ে তারা সরকারের শীর্ষ দুই নিরাপত্তা–দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে অগ্রগতি জানানো না হলে পদত্যাগের দাবি তোলা হয়।
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শেষে এই সমাবেশ শুরু হয়। বিকেল গড়াতেই শাহবাগ এলাকায় জনসমাগম বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পুরো মোড়জুড়ে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা। ফলে শাহবাগ হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মত প্রকাশ ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত।
তার ভাষায়, আমরা কোনো আলাপ–আলোচনার পথে যাব না। আগে খুনিদের গ্রেপ্তার করতে হবে। বিচার নিশ্চিত না হলে এই আন্দোলন থামবে না।
তিনি জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র) খোদা বখস চৌধুরীকে জনসম্মুখে এসে জানাতে হবে হত্যাকারীদের ধরতে তাঁরা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন। অন্যথায় তাঁদের পদত্যাগ দাবি করা হবে।
বিকেলজুড়ে শাহবাগে নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে উঠে আসে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও প্রতিবাদী নানা স্লোগান। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা সড়কের ওপর আসরের নামাজ আদায় করেন। এতে আন্দোলনের ধর্মীয় ও আবেগী দিকটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আয়োজকেরা দাবি করেন, পুরো কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল। কোনো ধরনের সহিংসতা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। তবে জনসমাগমের কারণে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তি দেখা দেয়।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বিভিন্ন মহল পরিকল্পিতভাবে মূল দাবি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, দেশি–বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে ওসমান হাদির হত্যার বিচার প্রশ্নটিকে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কেউ যেন নাশকতা বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের ফাঁদে না পড়ে। আন্দোলনকারীদের শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা দেশের স্থিতিশীলতা চাই। কিন্তু স্থিতিশীলতার নাম করে খুনিদের রক্ষা করা চলবে না।
সমাবেশ শেষ ঘোষণা করে ইনকিলাব মঞ্চ জানায়, আপাতত আন্দোলনকারীদের বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার পক্ষ থেকে সন্তোষজনক জবাব না এলে রোববার বিকেল সোয়া পাঁচটায় আবার শাহবাগে জড়ো হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, আমরা ছাড় দিয়েছি, আর ছাড় দেব না। এ আন্দোলন ব্যক্তির নয়, এটি ন্যায়বিচারের আন্দোলন।
সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সীমিত আকারে যান চলাচল শুরু হলেও সন্ধ্যা ছয়টার আগে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ক্ষোভ শুধু একটি সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তাদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার কী অবস্থান নেয়, তার ওপর পরিস্থিতির গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে। দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত না হলে এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে।
২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার দিকে এখন সবার নজর। সরকার যদি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শাহবাগ আবারও বড় আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একদিকে বিচার ও জবাবদিহির দাবি, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।