বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘাতের আঁচ আবারও এসে লেগেছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে আসা গুলিতে ৯ বছরের এক বাংলাদেশি শিশু গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা।
মঙ্গলবার ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াউ সোয়ে মো-কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের ওপর এই ধরনের অপ্ররোচিত গুলি চালানো আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য মারাত্মক অন্তরায়।
গত রোববার সকাল ৯টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ সীমান্ত এলাকায় শিশু হুজাইফা গুলিবিদ্ধ হয়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে অতর্কিতভাবে ছোড়া একটি গুলি এসে লাগে ৯ বছরের শিশু হুজাইফা আফনানের গায়ে। গুলিতে গুরুতর আহত হুজাইফাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সবশেষ খবর অনুযায়ী, অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলেও তার শারীরিক অবস্থা এখনো অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল সোমবার সকালে হোয়াইক্যং সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে মো. হানিফ (২৮) নামের এক যুবকের বাঁ পা উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। একের পর এক এসব সহিংসতায় সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াউ সোয়ে মো উপস্থিত হলে তাকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তলবের সময় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে:
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: বাংলাদেশে অপ্ররোচিতভাবে গুলি চালানো এবং এর ফলে বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়া আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
সম্পর্ক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত: সুষ্ঠু পার্শ্ববর্তী বা নেইবারলি রিলেশন বজায় রাখতে হলে এই ধরনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
মিয়ানমারের দায়বদ্ধতা: মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং তাদের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (আরাকান আর্মি বা জান্তা বাহিনী) অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের প্রভাব যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর না পড়ে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ মিয়ানমারের।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনার সময় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াউ সোয়ে মো গত রোববারের ঘটনার জন্য আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেন। আহত শিশু হুজাইফা এবং তার পরিবারের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, তার সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলা সংঘর্ষের কারণে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো প্রায়ই আক্রান্ত হচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে মর্টার শেল পড়া, আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) তাদের টহল ও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ওপারে সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়লে এপারে জীবনযাপন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে অনেক এলাকায়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে তলব করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও কেবল আশ্বাসে সীমান্ত সুরক্ষিত হবে না। এর আগেও মিয়ানমার বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা এবং সীমান্তে নজরদারি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
হুজাইফা আফনানের সংকটাপন্ন অবস্থা এবং স্থলমাইনে যুবকের পা হারিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সরকার একদিকে যেমন কূটনৈতিকভাবে চাপ বজায় রাখছে, অন্যদিকে সীমান্তে সুরক্ষা বাড়াতে বদ্ধপরিকর। এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্রদূত যে আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন, মিয়ানমার সরকার বাস্তবে তার কতটুকু বাস্তবায়ন করে।
এএন