শীতের রাজত্ব এখন মাঝপথে। মাঘের শুরুতে প্রকৃতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দিনের বেলা সূর্যের নরম আলোতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও, সূর্য ডোবার সাথে সাথেই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। চারপাশ আঁকড়ে ধরছে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, আগামী পাঁচ দিন দেশের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, তবে উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহের দাপট অব্যাহত থাকবে।
আজ শনিবার সকালে প্রকাশিত পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, আগামী ১২০ ঘণ্টা বা পাঁচ দিনের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি মূলত শুষ্ক থাকবে, তবে ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসের দাপটে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়তে পারে।
উচ্চচাপ বলয়ের প্রভাব আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমানে উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তার আশেপাশের এলাকায় অবস্থান করছে। এর পাশাপাশি মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপটি দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যার একটি বর্ধিত অংশ উত্তর পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই বায়ুমণ্ডলীয় বিন্যাসের কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্রতা কমে গেছে এবং উত্তর দিক থেকে আসা হিমেল বাতাস সরাসরি দেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। ফলে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও বাতাসের কামড় অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
শৈত্যপ্রবাহের কবলে তিন জেলা দেশের সব জায়গায় শীত থাকলেও তীব্রতার বিচারে তিনটি জেলা এখন রেড জোনে রয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে দিনাজপুর, পঞ্চগড় এবং চুয়াডাঙ্গা জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
এই জেলাগুলোতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এসেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উত্তরের জেলাগুলোতে হিমালয়ের হিম বাতাস সরাসরি আঘাত হানছে। চুয়াডাঙ্গায় গত কয়েকদিন ধরেই জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। শ্রমজীবী মানুষ ভোরে কাজে বের হতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন।
আবহাওয়া অফিস আগামী মঙ্গলবার ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছে। শনিবার সারা দেশের আকাশ অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। নদী অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র হালকা কুয়াশা পড়বে। রাতের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকলেও দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, দুপুরবেলা কিছুটা উষ্ণতা মিলতে পারে। রোববার কুয়াশার দাপট আরও বাড়বে। নদী অববাহিকায় নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে। রাতের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকলেও দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে শুরু করবে। দুপুরের রোদের তেজ কিছুটা কমে আসতে পারে। সোমবার ও মঙ্গলবার এই দুই দিন আবহাওয়া প্রায় একই রকম থাকবে। সকালবেলা কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকবে চারপাশ।
তবে রাতের বেলা তাপমাত্রা আবার কিছুটা কমতে পারে, যা ঠান্ডার অনুভূতি বাড়িয়ে দেবে। বর্ধিত ৫ দিনের সংকেতে আবহাওয়া অফিসের বার্তাটি বেশ উদ্বেগের। বলা হয়েছে, এ সময় রাত ও দিনের তাপমাত্রা আরও কমবে।
অর্থাৎ, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে দেশজুড়ে আরও একটি বড় শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
কুয়াশার সতর্কতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নদীমাতৃক বাংলাদেশে শীতের কুয়াশা কেবল একটি দৃশ্য নয়, এটি একটি বড় সংকট। নদী অববাহিকার জেলাগুলোতে বিশেষ করে মাওয়া, আরিচা এবং দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে ঘন কুয়াশার কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত চালকরা যেন কুয়াশাভেদী আলো বা ফগ লাইট ব্যবহার করেন এবং গতির সীমাবদ্ধতা মেনে চলেন। উত্তরবঙ্গের মহাসড়কগুলোতে কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা ১০০ মিটারের নিচে নেমে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শীতের এই লুকোচুরি আবহাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। দিনের বেলা রোদের কারণে ঘাম হওয়া এবং রাতে তীব্র ঠান্ডার কারণে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, শীতকালীন ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। চিকিৎসকরা শিশুদের কুসুম গরম পানি পান করানোর এবং রাতের বেলা বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, কৃষিখাতেও এর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে বোরো ধানের বীজতলা রক্ষা করতে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কুয়াশা বেশি হলে আলু চাষীদের লেট ব্লাইট বা ধসা রোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
আরও কঠিন শীতের প্রস্তুতি সামগ্রিক বিশ্লেষণ বলছে, মাঘের হাড়কাঁপানো শীত কেবল শুরু হতে যাচ্ছে। দিনের বেলা রোদ দেখে শীত শেষ হয়ে যাচ্ছে ভাবলে ভুল হবে। বরং এটি একটি সাময়িক বিরতি মাত্র। জানুয়ারির শেষভাগে তাপমাত্রা আরও কমার যে পূর্বাভাস পাওয়া গেছে, তার জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে ছিন্নমূল ও নিম্নবিত্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির এই রূপবদলের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নাগরিক সতর্কতাই এখন প্রধান হাতিয়ার। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা এবং শীতকালীন রোগবালাই থেকে বাঁচতে সচেতন থাকাই কাম্য।
জেএইচআর