বিদেশে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, সেই প্রবাসী কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মদিনা ও জেদ্দা থেকে ঢাকা ফেরার বিমান ভাড়া অবিশ্বাস্যভাবে কমিয়ে মাত্র ২০ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত হজের মৌসুমে বিমানের ফাঁকা ফ্লাইটগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রবাসীদের এ সাশ্রয়ী সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এ উদ্যোগের প্রধান কারিগর। তিনি জানান, এ বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় সৌদি আরব ও বাংলাদেশ মিলিয়ে মোট ৮০ হাজার টিকিট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগে দেখা যেত, হজের সময় হাজিদের নিয়ে যাওয়ার পর ফিরতি ফ্লাইটগুলো খালি আসত, আবার হাজিদের আনতে যাওয়ার সময়ও ফ্লাইট ফাঁকা থাকত।
উপদেষ্টা বলেন, আমরা এ ফাঁকা ফ্লাইটগুলোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে প্রবাসীরা যেমন সস্তায় যাতায়াত করতে পারবেন, তেমনি বিমানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এ খাত থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত মুনাফা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সরকার নির্ধারিত নতুন ভাড়ার হার অনুযায়ী প্রবাসীরা অত্যন্ত সুলভ মূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন। মদিনা বা জেদ্দা থেকে ঢাকা আসতে একমুখী ভাড়া লাগবে সর্বনিম্ন ২০ হাজার ৫০০ টাকা। মদিনা থেকে ঢাকা হয়ে পুনরায় মদিনা অথবা জেদ্দা থেকে ঢাকা হয়ে পুনরায় জেদ্দায় ফেরার রিটার্ন টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য রাখা হয়েছে ৪২ হাজার টাকা।
সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে আসার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে ২৫ মে পর্যন্ত। আবার বাংলাদেশ থেকে সৌদিতে ফেরার সময়সীমা ২০২৬ সালের ৩০ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত।
এ উদ্যোগকে প্রবাসীবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি সময়োপযোগী এ পদক্ষেপের জন্য বিমান উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনকে ধন্যবাদ জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাস্তবমুখী এ সিদ্ধান্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রা সহজ করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণীও উচ্চারণ করেছেন।
তিনি বলেন, অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগ সঠিক তদারকির অভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এ উদ্যোগটি যেন শতভাগ স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার সাথে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে।
সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ২৫ লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। বিমান ভাড়ার আকাশচুম্বী দামের কারণে অনেক সাধারণ শ্রমিক বছরের পর বছর দেশে ফিরতে পারেন না। সরকারের এ ২০ হাজার টাকার টিকিটের ঘোষণা প্রবাসীদের মাঝে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেট ভেঙে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রবাসীরা যাতায়াত খরচ সাশ্রয় করতে পারলে সেই অর্থ তারা বৈধ পথে রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে পাঠাতে পারবেন, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়ে। কিন্তু হজের ফিরতি ফ্লাইটে সাধারণ যাত্রীদের সুযোগ দেওয়ার এ বাণিজ্যিক মডেলটি বিমানের ইতিহাসে একটি গেম চেঞ্জার হতে পারে। ১০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে বিমান সংস্থাটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আরও আধুনিক সেবা প্রদানে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের ত্যাগ ও পরিশ্রমের প্রতিদান হিসেবে এ সাশ্রয়ী বিমান ভাড়া কেবল একটি অর্থনৈতিক ছাড় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি এক বিশাল সম্মাননা। যদি এ প্রক্রিয়াটি কোনো ধরনের অনিয়ম ছাড়াই সম্পন্ন হয়, তবে এটি ভবিষ্যতের অন্যান্য রুটেও মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।