সুশাসনে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যয়

আশার মাঝেও যেখানে শঙ্কার মেঘ দেখছে টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারপ্রধানের সাম্প্রতিক কিছু ঘোষণা নাগরিক সমাজে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তবে এই আশাবাদের সমান্তরালে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে থাকা গভীর ক্ষতগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকারের দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একগুচ্ছ সুপারিশমালা পেশ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে 'জিরো টলারেন্স' বা শূন্য সহনশীলতার বার্তা দিয়েছেন, তা জনমনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় অবস্থান যদি আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক তৃণমূল পর্যন্ত সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক চেহারায় আমূল পরিবর্তন সম্ভব।

তিনি উল্লেখ করেন, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, যা অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকে টিআইবি স্বাগত জানালেও, মন্ত্রিসভার কোনো কোনো সদস্যের বক্তব্যে সংস্থাটি গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছে। 

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মহামান্য প্রধানমন্ত্রী যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, সেখানে কয়েকজন মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভিন্ন সুর পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদের কারো কারো কথা ও কাজে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা সরকারের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।’

টিআইবির মতে, মন্ত্রিসভার ভেতরে যদি দুর্নীতি দমনে ঐকমত্য না থাকে, তবে কেবল সরকারপ্রধানের একার পক্ষে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করা সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘পলিটিক্যাল টুল’ বা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় 

শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশন এবং বিচার বিভাগকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং অন্যের সম্পত্তি দখলকে যারা 'স্বাভাবিকতা' দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকরের দাবি জানানো হয়।

সুশাসন নিশ্চিতে টিআইবি এবার বেশ কিছু সাহসী ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন কমিশনের অধীনে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। যাতে বদলি, পদায়ন বা তদন্তে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকে।

দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। টিআইবির মতে, মানবাধিকার রক্ষা এবং বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটাতে এই বাহিনীটির সংস্কার বা বিলুপ্তি এখন সময়ের দাবি।

সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনীতিতে দুর্নীতির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। ব্যাংক খাত ও বড় বড় মেগা প্রজেক্টে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'আমরা দেখছি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং দখলবাজির অপচেষ্টা চলছে। সরকারকে কঠোর নির্দেশনার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোনো অশুভ শক্তির কাছে জিম্মি নয়।

সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে টিআইবি প্রধান সতর্ক করে বলেন, কেবল ঘোষণা দিলেই দুর্নীতি কমে যায় না, বরং এর জন্য প্রয়োজন কঠিন প্রয়োগ। প্রধানমন্ত্রী যে আশার আলো দেখিয়েছেন, তা যেন কেবল কথার কথা হয়ে না থাকে। দেশের মানুষ এখন দেখতে চায় রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা।

সরকার কি পারবে টিআইবির এই সুপারিশগুলো গ্রহণ করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে? নাকি মন্ত্রীদের বৈপরীত্যমূলক বক্তব্যের ভিড়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যাবে তা সময়ই বলে দেবে।

এএন