তথ্য কমিশনের স্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা নিয়ে ইফতেখারুজ্জামানের কঠোর সমালোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২৬, ০৪:০০ পিএম

রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং তথ্য কমিশনকে অকার্যকর রাখার প্রবণতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি অভিযোগ করেছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেও তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সদিচ্ছার ঘাটতি ছিল। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেখা গেছে।

রোববার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে 'তথ্য অধিকার ফোরাম' আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। অনতিবিলম্বে তথ্য কমিশন গঠন এবং তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবিতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথ্য অধিকার আইন থাকার মূল লক্ষ্যই হলো জনগণের তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে তথ্য কমিশনকে একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছিল।

দুঃখজনক বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেও আমরা সেই একই চিত্র দেখেছি। হয়তোবা তাদেরও এমন কিছু লুকানোর ছিল, যার কারণে পুরো চর্চাটাই ছিল অন্ধকারের মধ্যে।

তিনি আরও যোগ করেন,ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে উন্মুক্ততার সংস্কৃতিতে যাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে দেশের মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তারা তথ্য কমিশন গঠন না করে সেই আস্থার অমর্যাদা করেছে। আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও দেড় বছর তথ্য কমিশনকে প্রতিষ্ঠিত হতে না দেওয়া অত্যন্ত বিব্রতকর।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বর্তমান ও বিগত সময়ের শাসন প্রক্রিয়ার তুলনা করে বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে যে ‘চোরতন্ত্রের’ শাসন চলেছে, সেখানে অন্য সব কমিশনের মতো তথ্য কমিশনকেও ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতার পরোয়া করা হয়নি।

তার মতে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তথ্য কমিশন গঠন ঠেকিয়ে রাখা ছিল একটি উদ্দেশ্যমূলক পদক্ষেপ।

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে দেশের তথ্য প্রাপ্তির পরিবেশ উন্নত করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. দলীয় প্রভাবমুক্ত কমিশন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তথ্য কমিশন গঠন করতে হবে।

২. আইনি সংস্কার: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারিকৃত তথ্য অধিকার অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে পেশ করার আগে তথ্য অধিকার ফোরামের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৩. জনমত যাচাই: কোনো আইনি পরিবর্তন বা অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করার আগে তা জনসাধারণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন তথ্য অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক শাহীন আনাম। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

সাবেক শ্রমবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান এবং নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেনও তথ্য অধিকারের প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান সীমাবদ্ধতা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তারা সম্মিলিতভাবে মনে করেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ পাস হওয়ার পর থেকে দেশে তথ্য পাওয়ার অধিকার আইনি স্বীকৃতি পেলেও এর প্রয়োগ নিয়ে বরাবরই বিতর্ক থেকেছে। টিআইবি প্রধানের এই বক্তব্য রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা ‘গোপনীয়তা রক্ষার প্রবণতা’কে আবারও সামনে নিয়ে এলো। তথ্য কমিশন যদি স্বাধীন ও কার্যকরভাবে কাজ করতে না পারে, তবে জনগণের জানার অধিকার কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এএন