বাংলাদেশের নবগঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে অবশেষে চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক অধিবেশন।
শনিবার বিকেলে সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটির প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংবিধান সংস্কারের জোরালো দাবির মধ্যে এই দীর্ঘ অধিবেশন সময়সূচিকে দেশের স্থিতিশীলতার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আজ বিকেল পৌনে ৩টায় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধিবেশনের নতুন সূচি ঘোষণা করেন। সূচি অনুযায়ী, আগামীকাল রোববার অধিবেশন শেষে একটি সংক্ষিপ্ত মুলতবি দেওয়া হবে। এই বিরতি চলবে ২৮ মার্চ পর্যন্ত। এরপর ২৯ মার্চ থেকে সংসদ পুনরায় সক্রিয় হবে এবং এটি বিরতিহীনভাবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সচল থাকবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘ এই বিরতি মূলত রমজান ও ঈদের প্রস্তুতির জন্য রাখা হয়েছে, যাতে ২৯ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অধিবেশনে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া যায়।
ত্রয়োদশ সংসদের এই অধিবেশনে কেবল গতানুগতিক আইন প্রণয়ন নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের বা সংস্কারের ইস্যুটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, বৈঠকে প্রথম অধিবেশনে উত্থাপনযোগ্য বিভিন্ন বিল এবং প্রস্তাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা বা নিষ্পত্তি এই সংসদেই হবে।
এটি মূলত ১১ দলীয় ঐক্যের দেওয়া আলটিমেটাম এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবির প্রেক্ষাপটে সরকারের একটি কৌশলী অবস্থান হিসেবে মনে করা হচ্ছে। যেখানে রাজপথে আন্দোলনের হুমকি রয়েছে, সেখানে সরকার সংস্কারের ফয়সালা সংসদে করার বার্তা দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু রাজপথ থেকে সরিয়ে সংসদ ভবনে নিয়ে আসতে চাইছে।
আজ বেলা সাড়ে ১২টায় শুরু হওয়া এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন নবনির্বাচিত স্পিকার। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাসহ কমিটির অন্যান্য সিনিয়র সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।
দীর্ঘ দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠকে অধিবেশনের স্থায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি সংসদের বিজনেস ক্যালেন্ডার বা কাজের তালিকা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। বিশেষ করে, সংস্কার পরিষদের দাবি এবং সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে যে উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তা প্রশমিত করার জন্য সংসদীয় কৌশলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এই বৈঠকে।
অধিবেশন ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত করায় সরকারের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকবে বিরোধী দলের সাথে সংলাপ বা সংস্কার প্রস্তাবগুলো যাচাই বাছাই করার। তবে ১১ দলীয় ঐক্য ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তারা রাজপথে আন্দোলনে যাবে যদি দ্রুত সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকা হয়। এখন দেখার বিষয়, ২৯ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া অধিবেশনে সরকার সংস্কারের কোন রোডম্যাপ জনসমক্ষে তুলে ধরে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অধিবেশনটি হবে দেশের সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং বিতর্কপূর্ণ একটি পর্ব। যদি ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সংস্কারের বিষয়ে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট ঐক্যমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দেবে।
অন্যথায়, অধিবেশনের দীর্ঘতা রাজনৈতিক জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ত্রয়োদশ সংসদ কেবল একটি নতুন মেয়াদের সূচনা নয়, বরং এটি ভেঙে পড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের একটি দায়ভার কাঁধে নিয়েছে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলার ঘোষণা দেওয়া এই অধিবেশনই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে, সংস্কারের পথে নাকি সংঘাতের পথে।
জেএইচআর