ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ ডিবি হেফাজতে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৬, ০৭:২৭ এএম
  • নেপথ্যে এক-এগারোজলসিঁড়ি প্রকল্পসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। 

বুধবার গভীর রাতে রাজধানীর একটি বিশেষ এলাকা থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিবি পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এই আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

বিগত কয়েক দিন ধরে উচ্চপদস্থ সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের আটকের যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে, শেখ মামুন খালেদের আটক সেই তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করল। 

বিশেষ করে গত সোমবার রাতে সাবেক সেনাসদস্য ও এক-এগারোর অন্যতম আলোচিত মুখ লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের রেশ কাটতে না কাটতেই এই ঘটনাটি ঘটল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেখ মামুন খালেদ বেশ কিছু দিন ধরেই গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। বুধবার রাতে ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে তাকে আটক করে। 

তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কেবল পেশাগত সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক খাতের নানা অনিয়মের সাথে জড়িত। গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়েছে।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা: ডিজিএফআই-এর মতো একটি সংবেদনশীল সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে তার মেয়াদে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারে কাজ করার অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এক-এগারোর বিতর্কিত ভূমিকা: ২০০৭-০৮ সালের সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ মামুন খালেদ ডিজিএফআই-এর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। 

সেই সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর দমন-পীড়ন এবং 'মাইনাস টু ফর্মুলা' বাস্তবায়নে তার ভূমিকার বিষয়ে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান চলছিল।

জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে অনিয়ম: সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন কাজে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। 

প্রকল্পটির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সময় তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বিদেশে যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও দুদকের পদক্ষেপ
উল্লেখ্য যে, শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া গত বছর থেকেই জোরালো হতে শুরু করে। ২০২৫ সালের মে মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত শেখ মামুন খালেদ এবং তার স্ত্রী নিগার সুলতানার বিদেশযাত্রায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। 

ওই সময় দুদকের অনুসন্ধানে তাদের নামে অঢেল সম্পদ এবং সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। দেশের বাইরে অর্থ পাচারের আশঙ্কায় আদালত এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।

শেখ মামুন খালেদ ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তাকে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। 

তারও আগে ২০০৭-০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের শেষ দিকে তিনি গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। কর্মজীবনের শেষ দিকে তিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) কমান্ড্যান্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অ্যাকশন বেশ জোরালো হয়েছে। গত সোমবার রাতে এক-এগারোর অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

মানব পাচারের একটি মামলায় বর্তমানে তিনি রিমান্ডে রয়েছেন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ধারাবাহিকতায় শেখ মামুন খালেদের এই আটক সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিগত বছরগুলোর অপ্রকাশিত অনিয়ম ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটকের পর শেখ মামুন খালেদকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর নথিপত্র এবং দুদকের সংগ্রহ করা প্রমাণাদি সমন্বয় করা হচ্ছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং প্রয়োজনে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে।

ডিবি সূত্র আরও জানায়, কেবল শেখ মামুন খালেদই নন, তার সাথে সম্পৃক্ত আরও কয়েকজনের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। আর্থিক কেলেঙ্কারি বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এএন