বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার পর বন্ধ থাকবে দোকান-শপিং মল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা করেছে যে, এখন থেকে সারাদেশে সকল প্রকার দোকানপাট, শপিংমল এবং বাণিজ্যিক বিতান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।

সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নীতির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ সংগঠনটি স্বেচ্ছায় এই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ হ্রাসের ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রই বিদ্যুৎ উৎপাদনে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখতে জ্বালানি সাশ্রয় এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি মনে করে, ব্যবসায়ীরা যদি রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ রাখেন, তবে সেই বেঁচে যাওয়া বিদ্যুৎ শিল্প উৎপাদন এবং কৃষিকাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আজ সকালে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি এবং ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির স্ট্যান্ডিং কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। 

ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বলেন, দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেবে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমরা এই ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি। বিদ্যুৎ সাশ্রয় মানেই দেশের উন্নয়ন।

ব্যবসায়ীদের এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে কিছু জরুরি সেবাকে এই সময়সীমার বাইরে রাখা হয়েছে। 

তালিকায় রয়েছে- যেকোনো জরুরি চিকিৎসায় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ফার্মেসিগুলো পূর্বের নিয়মেই খোলা থাকবে, মানুষের খাবারের প্রয়োজন মেটাতে হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে, বিদ্যুৎ, পানি বা অন্যান্য জরুরি মেরামতি কাজের প্রতিষ্ঠান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সরবরাহে ব্যাঘাত না ঘটাতে কাঁচাবাজারগুলোও নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে রাখা হয়েছে।

রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করার এই সিদ্ধান্তটির বহুমুখী প্রভাব রয়েছে। একদিকে যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

হাজার হাজার শপিংমলের আলোকসজ্জা এবং এসি বন্ধ হওয়ার ফলে প্রতিদিন কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। দোকান ও বিপণিবিতানে কর্মরত লক্ষ লক্ষ কর্মী রাতে দ্রুত বাড়ি ফিরতে পারবেন এবং পরিবারকে সময় দিতে পারবেন।
রাত ৮টায় মার্কেট বন্ধ হয়ে গেলে অফিস ছুটির সময়ের যানজট এবং কেনাকাটার ভিড় আলাদা হয়ে যাবে, ফলে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সুশৃঙ্খল হবে।

হঠাৎ করে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনলে ব্যবসায়িক বিক্রয় বা টার্নওভারে কিছুটা প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে যারা দিনের শেষে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত, তাদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। তবে সমিতি মনে করে, ক্রেতারা যদি সন্ধ্যা হওয়ার আগেই তাদের কেনাকাটা সম্পন্ন করেন, তবে লোকসানের কোনো আশঙ্কা নেই।

ব্যবসায়ী মালিক সমিতি সকল ব্যবসায়ীর প্রতি এই নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সরকারের কাছে অনুরোধ করেছে, এই সাশ্রয়কৃত বিদ্যুৎ যেন উৎপাদনশীল খাতে সঠিকভাবে বণ্টন করা হয় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর বা ভ্যাট সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কেবল একটি খাতের বিষয় নয়, এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের সম্পদ। আন্তর্জাতিক এই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এই সাহসী পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি প্রমাণ করে যে, দেশের প্রয়োজনে ব্যবসায়ীরা কেবল লাভের কথা ভাবেন না, বরং জাতীয় দায়িত্ব পালনেও তারা অগ্রগামী।

এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সাধারণ ক্রেতা এবং স্থানীয় প্রশাসন কতটা সহযোগিতা করে। নিয়ম মেনে চললে আমরা কেবল বিদ্যুৎই সাশ্রয় করব না, বরং একটি পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল বাণিজ্যিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হব।

এএন