প্রস্তাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৫’ বাস্তবায়ন হলে দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষ এবং বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার মানবিক কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন কোস্ট ফাউন্ডেশনসহ নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন।
মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুদ্রঋণ খাতকে ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা।
সংগঠনগুলোর মতে, ক্ষুদ্রঋণ শুধু একটি আর্থিক কার্যক্রম নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী সামাজিক উন্নয়ন কাঠামো, যা নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তারা বলেন, ক্ষুদ্রঋণ একটি মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থা, যেখানে ঋণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, সামাজিক সংগঠন ও সহায়তার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কাজ করা হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬৮৩টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এ খাতের সঙ্গে যুক্ত সদস্য সংখ্যা ৩ কোটির বেশি। অন্যদিকে খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী সদস্য সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ এবং ঋণগ্রহীতা ১ কোটি ৫৮ লাখের বেশি। এই খাতকে তারা দেশের “তৃণমূল অর্থনীতির মেরুদণ্ড” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে লাইসেন্স প্রদান, ন্যূনতম মূলধন নির্ধারণ, ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় পরিচালনা এবং সামাজিক ব্যবসার ধারণায় পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে ক্ষুদ্রঋণ খাত আরও আধুনিক ও সম্প্রসারিত হবে।
তবে খাত সংশ্লিষ্ট অনেক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞের মতে, ক্ষুদ্রঋণ মূলত উন্নয়নভিত্তিক ও অলাভজনক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটিকে ব্যাংকে রূপান্তর করা হলে এটি মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়তে পারে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সেবার পরিধি সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে গত ৪ জানুয়ারি দেশের ১৭টি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা এ বিষয়ে এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ খাতটির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
সংগঠনগুলো আরও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, নতুন কাঠামোর কারণে লক্ষ্যচ্যুতি (Mission Drift), আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বৃদ্ধি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নের মতো সামাজিক কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং দুর্যোগের সময় মানবিক সহায়তা হ্রাস পেতে পারে। বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি সহায়তা দিয়ে থাকে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সীমিত হয়ে যেতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
অন্যদিকে ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (CDF) এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, প্রস্তাবিত আইন সামাজিক ব্যবসার ভিত্তিতেই পরিচালিত হবে এবং এটি দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে সংগঠনগুলো কয়েকটি সুপারিশও দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্রঋণের মানবিক কাঠামো বজায় রাখা, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF), মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA) ও এনজিও ব্যুরোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক নিরীক্ষা চালু এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতিনির্ধারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্রঋণ খাত বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সফল মডেল। তবে এটিকে ব্যাংকিং কাঠামোয় আনার উদ্যোগ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিতর্কে পরিণত হয়েছে। সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা না গেলে এই উদ্যোগ বিদ্যমান সফল ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
এএন