দেশজুড়ে বয়ে চলা দাবদাহের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য আরও অস্বস্তির খবর জানালো বিদ্যুৎ বিভাগ। জ্বালানি স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, যার ফলে আজ বৃহস্পতিবার সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি বা লোডশেডিং হতে পারে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা জানান, আজ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হতে পারে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
এর আগে গতকাল বুধবারও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ছিল না। বুধবার ১৫ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ গতকালও দেশবাসীকে ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হয়েছিল।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকলেও কেবল গ্যাসের অভাবে অর্ধেকের বেশি গ্যাসচালিত কেন্দ্র বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চলছে।
সক্ষমতা বনাম উৎপাদন: গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট হলেও গতকাল উৎপাদন করা গেছে মাত্র ৫ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট।
গ্যাসের সরবরাহ: সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য দিনে ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অন্তত ১২০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ থাকলেও ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়াকেও এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া উৎপাদন খরচ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলোর ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে।
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট: কারিগরি ত্রুটির কারণে ভারতের আদানির একটি ইউনিট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে আশা করা হচ্ছে ২৬ এপ্রিল এটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরবে।
এসএস পাওয়ার (বাঁশখালী): বাঁশখালীর এই কেন্দ্রের একটি ইউনিটে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে জাতীয় গ্রিডে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। এটি ২৮ এপ্রিল নাগাদ সচল হতে পারে।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগ একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে, যা গ্রীষ্মের লোডশেডিং কমাতে সহায়ক হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ক্রমবর্ধমান গরম এবং নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার ফলে বিদ্যুতের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিংয়ের ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চলমান সেচ মৌসুমে কৃষকদের যেন সমস্যা না হয়, সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে।
তবে বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ঢাকা শহরকে আপাতত লোডশেডিংমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্যমতে, অবকাঠামো থাকলেও জ্বালানির অভাবে দেশ আজ অন্ধকারের পথে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা আর অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংকটের জোড়া ধাক্কায় বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ খাত। মে মাসের শুরুতে নতুন উৎপাদন যুক্ত হওয়ার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সাধারণ মানুষ এখন সেই দিনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তবে আপাতত এই তপ্ত গরমে ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি দেশবাসীর ধৈর্য ও সহনশীলতার বড় পরীক্ষা নেবে।
এএন