চাহিদা বাড়ায় কোরবানির হাটে ভালো লাভের আশা পশু ব্যবসায়ীদের

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম

পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসায় দেশজুড়ে খামারি ও গবাদিপশু ব্যবসায়ীরা নতুন আশা নিয়ে কোরবানির হাটে যাওয়ার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও সুস্থ-সবল পশুর চাহিদা বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে তারা এবার ভালো মুনাফা অর্জনের আশা করছেন।

ঢাকার উপকণ্ঠের বিশাল সব অ্যাগ্রো ফার্ম থেকে শুরু করে নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গোয়ালঘর পর্যন্ত কয়েক মাস ধরেই কোরবানির পশু বেচাকেনার এই বিশেষ মৌসুমের প্রস্তুতি চলছে। খামারিরা জানান, পশুখাদ্য, ওষুধ, শ্রম, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও পবিত্র ঈদুল আজহার ধর্মীয় গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে তারা সুস্থ ও মানসম্মত পশু লালন-পালনে কোনো প্রকার আপস করেননি।

ঢাকার সাভার এলাকার হায়দার ডেইরি অ্যান্ড অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী শাদমান হায়দার আমানত এই মৌসুমে বিক্রির জন্য কমপক্ষে ৩০টি গরু প্রস্তুত করেছেন। তিনি বলেন, এ বছর পশুপালনের খরচ অনেক বেড়েছে। তবে ক্রেতারা যেহেতু ভালো ও মানসম্মত পশু খোঁজেন, তাই আমরা সঠিক যত্ন ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পেছনে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছি। আশা করছি, খামারিরা এবার পশুর ন্যায্যমূল্য পাবেন।

মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহাকে ঘিরে প্রতি বছর দেশজুড়ে বিপুল পরিমাণ গবাদিপশু কেনাবেচা হয়। এ সময় লাখো পরিবার কোরবানির জন্য ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পশু কেনেন।

ব্যবসায়ী ও খামার উদ্যোক্তারা বলছেন, এ বছর বিশেষ করে ঢাকাসহ দেশের শহরাঞ্চলগুলোতে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা অনেক বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি এতে বড় ভূমিকা রাখছে। খামারিদের মতে, ২০০ থেকে ৫০০ কেজি ওজনের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ৫০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা বাজেটের মধ্যে ক্রেতারা বাজারে তাদের পছন্দমতো পশু কিনতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

উদ্যোক্তা আমানত আরও বলেন, সুস্থ ও চঞ্চল পশু সৎ খামারির পরিচয় বহন করে। বাজারে অস্বাভাবিক কম দামের পশুর বিষয়ে মানুষের সতর্ক থাকা উচিত, কারণ সেগুলো হয়তো বৈজ্ঞানিক ও সঠিক নিয়মে লালন-পালন করা হয়নি।

নোয়াখালীর আমানিয়া অ্যাগ্রোর মালিক সাইদুর রহমান সিফাতও ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ নিয়ে একই উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, পশুখাদ্য থেকে শুরু করে পরিবহন সবকিছুর খরচই বেড়েছে। তারপরও আমরা আশাবাদী, কারণ মানসম্মত ও সুস্থ পশুর চাহিদা বাজারে সবসময়ই বেশি থাকে। তার খামারে এ বছর কোরবানির হাটে তোলার জন্য ৫০ থেকে ৬০টি গরু ও ছাগল প্রস্তুত রয়েছে।

খামারিরা বলছেন, দেখতে সুন্দর ও রোগমুক্ত মাঝারি আকারের গরুর দাম কোরবানির মৌসুমজুড়ে ভালোই থাকবে। কারণ ক্রেতারা এখন অতিরিক্ত বড় ও চড়া দামের পশুর চেয়ে সাশ্রয়ী, মানসম্পন্ন ও প্রাকৃতিকভাবে লালন করা পশুর দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। আর্থিক চাপ থাকলেও নৈতিক খামার ব্যবস্থাপনা ও পশুর সুস্বাস্থ্যের কল্যাণে নিজেদের অঙ্গীকারে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন খামারিরা। সিফাত বলেন, কোরবানির মূল চেতনা হলো আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ। পরিবারগুলো যেন আস্থা ও স্বস্তির সাথে কোরবানি দিতে পারে, সে জন্য খামারিরা সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশুর বাজারের সার্বিক পরিবেশ এখন ‘তুলনামূলক ইতিবাচক’। ঈদের মূল ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই অনেক সচেতন ক্রেতা সরাসরি খামারে যাচ্ছেন ও খোঁজখবর নিচ্ছেন, এমনকি অনেকে পছন্দের পশু আগাম বুকিংও দিয়ে রাখছেন।

রাজধানীর আব্দুল মালেক অ্যাগ্রোর মালিক সম্রাট মির্জা জানান, তার খামারে এই মৌসুমে ৮০ থেকে ৮৫টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ যত্নে বড় করা কয়েকটি বিশাল আকারের গরুও রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাজার পরিস্থিতি বেশ ইতিবাচক মনে হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণীর ক্রেতাদের মধ্যে ভালো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সম্রাট মির্জা আরও বলেন, প্রতিটি খামারি সারা বছর এই দিনটির জন্য পরিশ্রম করেন। আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, প্রতিটি পশু যেন কোরবানির জন্য কোনো না কোনো পরিবারের কাছে পৌঁছায়। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসবে, চাহিদা আরও বাড়বে বলে বিশ্বাস করি।

অন্যদিকে ছায়াবীথি অ্যাগ্রোর কর্মকর্তা শারমিন জানান, ঈদের বেশ কিছুদিন আগেই ক্রেতাদের কাছ থেকে উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। খামারে পশু বিক্রি ও খোঁজখবর নেওয়া দুটোই বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন নিজ প্রচেষ্টায় কোরবানির উপযুক্ত ও সুস্থ পশু খুঁজছেন। এতে একদিকে খামারিদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, একই সাথে কাজের অনুপ্রেরণাও পাচ্ছি। তিনি জানান, তাদের খামারের ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক পশু ইতোমধ্যে আগাম বুক হয়ে গেছে। ঈদের আগের সপ্তাহে বাজার আরও সরগরম হবে বলে আশা রাখি। সেই বাড়তি চাহিদা মেটাতেও আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছি।

এদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। এবার সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় ২২ লাখের বেশি গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কোরবানির পশুর আনুমানিক চাহিদা ১ কোটি ১০ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। আর এর বিপরীতে দেশজুড়ে সরবরাহযোগ্য প্রস্তুত পশুর সংখ্যা ধরা হয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। সেই হিসেবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু চাহিদার চেয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মোট সরবরাহযোগ্য পশুর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি; ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির গবাদিপশু রয়েছে ৫ হাজার ৬৫৫টি। সরকারের এই পর্যাপ্ত জোগানের কারণে বাজারে পশুর কৃত্রিম সংকট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং ক্রেতারা সাধারণ মূল্যের মধ্যেই পশু কিনতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। (সূত্র: বাসস)

জেএইচআর