রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের শুরুতেই কারিগরি জটিলতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি লোডিং (ফুয়েল লোডিং) শেষ করার পর এই ত্রুটি শনাক্ত হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে প্লান্টের কার্যক্রম বন্ধ (শাটডাউন) করে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদলসহ উচ্চপর্যায়ের একটি টিমের পরিদর্শন চলাকালেই এই ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, গত শুক্রবার (১২ জুন) রাতে প্রথম ইউনিটে চাপ (প্রেশার) প্রয়োগের পর একটি ছোট ত্রুটি নজরে আসে। এটি বড় কোনো সমস্যা নয় এবং দ্রুতই তা মেরামত করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষার সময় প্রকৌশলীরা তিনটি ভিন্ন স্থানে ছোট আকারের ছিদ্র (মাইনর হোলস) শনাক্ত করেছেন। এরপরই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী পরীক্ষা স্থগিত রেখে দ্রুত সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগেও এই কেন্দ্রে এমন ত্রুটি দেখা গিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, যেকোনো ছোটখাটো কারিগরি ত্রুটি বা নিরাপত্তা ঝুঁকির আভাস পেলেই নিউক্লিয়ার প্লান্ট শাটডাউন করার নিয়ম রয়েছে। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের শুরুতে এমন কিছু ঘটলেও একে বড় কোনো সংকট বলে তিনি মনে করছেন না।
এদিকে রূপপুর সফরে থাকা আইএইএ প্রতিনিধিরা জানান, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় তারা মূলত পরিদর্শকের ভূমিকা পালন করেন। তবে মূল রেগুলেটরি ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট দেশের হাতেই থাকে, আইএইএ কেবল কারিগরি সহযোগিতা দেয়।
এর আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের যৌথ আয়োজনে ‘নিউক্লিয়ার এনার্জি: স্ট্রাটেজি রিয়েলিটিজ অ্যান্ড বাংলাদেশ পাথ ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক দুই দিনের একটি কৌশলগত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা ও সরকারের পদক্ষেপের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদে এই কেন্দ্র থেকে তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রথম প্রকল্পের চূড়ান্ত সফলতার ওপর ভিত্তি করে সরকার আরও দুটি নতুন ইউনিট চালুর পরিকল্পনা করছে বলেও তিনি জানান।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি প্রসঙ্গে কর্মকর্তারা জানান, রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প বা সুনামির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহিদুল হাসান জানান, এখানে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা নেই বললেই চলে, যা অঙ্কের হিসাবে দশ লাখে মাত্র একবার হতে পারে।
উল্লেখ্য, দুই ইউনিটের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। গত ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এই কেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি লোডিং এবং সেপ্টেম্বর নাগাদ দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
এএন