দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে নতুন মাত্রায় নিতে চীনের আর্থিক সহায়তায় একগুচ্ছ বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সড়ক, সেতু ও রেল খাতের প্রায় ২০টি প্রকল্প নিয়ে একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে উড়াল মহাসড়ক, রাজধানীতে সাবওয়ে, নতুন এক্সপ্রেসওয়ে, রেললাইন উন্নয়ন এবং আধুনিক রেল অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণে নতুন উদ্যোগ
বর্তমান যমুনা সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন এই সেতু ব্যবহার করলেও ঈদসহ বিশেষ সময়ে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এতে দীর্ঘ যানজট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণে একাধিক বিকল্প নিয়ে সমীক্ষা চলছে। এর মধ্যে জামালপুর-গাইবান্ধা সংযোগ এবং বগুড়া-জামালপুর করিডর উল্লেখযোগ্য। নতুন সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন পরিকল্পনাবিদরা।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ভাবনা
সরকারের আলোচ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুও রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া এবং রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার মধ্যে নতুন সেতু নির্মাণ করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রুটে সেতু নির্মিত হলে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং বিদ্যমান পদ্মা সেতুর ওপর ভবিষ্যতের চাপও কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে নদী পারাপারের দীর্ঘদিনের ভোগান্তিও হ্রাস পাবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে উড়াল মহাসড়কের পরিকল্পনা
রাজধানী ও দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর। বর্তমানে এই পথে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যানবাহন চলাচল করে, যার কারণে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়ক নির্মাণের প্রস্তাব পুনরায় আলোচনায় এসেছে। অতীতে এ ধরনের একটি এক্সপ্রেসওয়ে পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন নতুন করে চীনা অর্থায়নে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
তবে একই করিডরে বিদ্যমান মহাসড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগও রয়েছে। ফলে উড়াল মহাসড়ক নাকি ভূমিভিত্তিক সম্প্রসারণ- কোনটি বেশি কার্যকর হবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
ঢাকার যানজট নিরসনে সাবওয়ে
রাজধানী ঢাকার দীর্ঘস্থায়ী যানজট সমস্যা সমাধানে পাতাল রেল বা সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও তালিকাভুক্ত হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিস্তৃত সাবওয়ে নেটওয়ার্কের সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে কাজ শুরু হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেট্রোরেলের পাশাপাশি সাবওয়ে চালু হলে গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং সড়কনির্ভরতা কমবে।
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
সাভারের হেমায়েতপুর থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত একটি নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ভেতর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের চাপ কমবে।
বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আগত যানবাহনকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে প্রবেশ না করেই গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে ঢাকা শহরের যানজট পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
নতুন সেতু নির্মাণে চীনা সহায়তা চায় সরকার
সেতু বিভাগের তালিকায় আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে পাবনা-রাজবাড়ী সংযোগ সেতু এবং নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ করিডরে দ্বিতীয় মুক্তারপুর সেতু নির্মাণ উল্লেখযোগ্য।
বর্তমান মুক্তারপুর সেতুর সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা থাকায় নতুন সেতু নির্মাণেও চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সেতু গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও পৃথক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
রেল খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা
চীনা অর্থায়নের জন্য রেলওয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘদিন ধরে এই রেলপথের আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। বর্তমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন ট্রেন চালু করা কিংবা গতি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রেল কর্তৃপক্ষ নতুন করে চীনা সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর করিডরে অতিরিক্ত রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। উত্তরাঞ্চলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বাড়তে থাকায় এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইঞ্জিন ও কোচ সংকট দূর করার উদ্যোগ
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচের সংকট রয়েছে। এ কারণে নতুন ট্রেন চালু করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় নতুন ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজবাড়ীতে একটি আধুনিক রেলওয়ে ওয়ার্কশপ নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে, যা ভবিষ্যতে রেলযানের রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়াবে।
সওজের নজর নতুন সেতু ও এক্সপ্রেসওয়েতে
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরও চীনা অর্থায়নে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে পটুয়াখালীর লোহালিয়া নদীতে নতুন মৈত্রী সেতু নির্মাণ অন্যতম।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় নদীগুলোর ওপর নতুন সেতু নির্মাণ, এক্সপ্রেসওয়ে সম্প্রসারণ এবং সড়ক নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে কারিগরি সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
শুধু অর্থায়ন নয়, প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু অর্থের ব্যবস্থা করলেই হবে না; এর সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনাও জরুরি। অতীতে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও প্রয়োজনীয় সংযোগ অবকাঠামো না থাকায় পূর্ণ সুফল পাওয়া যায়নি।
তাঁদের মতে, নতুন সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংযোগ সড়ক, নগর পরিবহন ব্যবস্থা এবং সেবাদান কাঠামোও একসঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে। অন্যথায় বিপুল বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে এখন নজর রয়েছে কোন কোন প্রকল্প চূড়ান্তভাবে অগ্রাধিকার পায় এবং কতটুকু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি আসে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, বাংলাদেশ-চীন অবকাঠামো সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে এই সফরের মধ্য দিয়ে।
এএন