গ্যাস সংকট আরও তীব্র, চরম দুর্ভোগে গ্রাহক ও শিল্প খাত

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ১০:২৫ এএম

বঙ্গোপসাগরের ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি এখনো পুরোপুরি মেরামত না হওয়ায় দেশজুড়ে চলমান তীব্র গ্যাস সংকট কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় মেরামতকাজ চললেও টার্মিনালটি কবে নাগাদ পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি পেট্রোবাংলা বা জ্বালানি মন্ত্রণালয়। ফলে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা ও সিএনজি খাতে ভোগান্তি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। গত মঙ্গলবার এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ছোট একটি অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার স্বার্থে সেটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রতিদিন ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, ভাসমান টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত করতে কত সময় লাগবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। বিদেশি প্রকৌশলীরা কাজ করছেন এবং অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, কারিগরি দল কাজ করলেও টার্মিনালটি এখনো চালুর উপযোগী অবস্থায় আনা যায়নি।

টার্মিনাল বন্ধের প্রভাবে রাজধানীর মগবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, কাফরুল, কলাবাগান, কাজীপাড়া ও পশ্চিম তেজতুরী বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। অনেক এলাকায় একেবারেই গ্যাস মিলছে না। ফলে অনেক পরিবার গভীর রাতে রান্না করছেন, কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন, আবার নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ লাকড়ি দিয়ে মাটির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন।

গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। আবদুল্লাহপুরের একটি সিএনজি স্টেশনের মালিক রেজাবুদ্দৌজা চৌধুরী জানান, দিনের বেলায় প্রায় কোনো গ্যাসই আসে না। রাতের দিকে অল্প চাপের গ্যাস দিয়ে সীমিত সংখ্যক গাড়িকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাইড শেয়ারিং ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্প খাত। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন শিল্পকারখানার বয়লার চালানো না যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ।

বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। লোকসানের আশঙ্কার পাশাপাশি প্রয়োজনে সমুদ্রপথের পরিবর্তে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হতে পারে, যা ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের গ্যাস খাত সীমিত সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সেই দুর্বলতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিকল্প হিসেবে স্থলভিত্তিক আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল থাকলে বর্তমান সংকট অনেকটাই এড়ানো যেত।

পেট্রোবাংলা গ্রাহকদের সাময়িক দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে, দেশি ও বিদেশি কারিগরি দল দ্রুততম সময়ে টার্মিনাল সচল করতে নিরলসভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় সব শ্রেণির গ্রাহককে স্বল্পচাপের গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জেএইচআর