আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নীতি ও আদর্শ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন 'বিভ্রান্তিকর' তথ্যের কড়া জবাব দিয়েছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ করে নারীদের অধিকার, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে জামায়াতের অবস্থান সম্পর্কে একটি বিশেষ মহলের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান দলের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন ও নির্বাচনী প্রচারণাকে কালঙ্কিত করতে ডিজিটাল মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
জামায়াত আমির তার পোস্টে উল্লেখ করেন, একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি করা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে নারীদের বিষয়ে জামায়াতের রক্ষণশীল মনোভাব রয়েছে বলে যে ধারণা প্রচার করা হচ্ছে, তাকে তিনি 'মিথ্যা বর্ণনা' হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, আমাদের অবস্থান ভুলভাবে উপস্থাপন করার লক্ষ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর কন্টেন্ট প্রচারিত হচ্ছে। আমাদের মূল্যবোধ স্পষ্ট করার জন্য এবং আমাদের নীতিমালা সম্পর্কে আলোচনা পুনরায় কেন্দ্রীভূত করার জন্য আমি এটি শেয়ার করছি।
নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জামায়াতের ইশতেহারের মূল পয়েন্টগুলো ডা. শফিকুর রহমান তার পোস্টে স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, জামায়াত চায় নারীরা কেবল ঘরে নয়, বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করুক। তার বর্ণনায় উঠে আসা প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো হলো:
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: মেয়েদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি জেলায় নারী-কেন্দ্রিক বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন।
নিরাপদ কর্মক্ষেত্র: কর্মক্ষেত্রে হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং সমান বেতন নিশ্চিত করা। এছাড়া কর্মজীবী মায়েদের জন্য উন্নত শিশু যত্ন (ডে-কেয়ার) সহায়তা প্রদান।
নেতৃত্ব ও রাজনীতি: রাজনীতি এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর নেতৃত্বকে উৎসাহিত করা এবং গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করতে বিশেষ ঋণ ও প্রশিক্ষণ সুবিধা দেওয়া।
আইনি সুরক্ষা: নারীদের ওপর সহিংসতা রোধে শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি।
জামায়াত আমির দাবি করেন, নারীদের বিষয়ে তাদের এই উদার ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি কোনো অনলাইন চাপ বা সাময়িক কৌশলের ফসল নয়। তিনি বলেন, এগুলো কোনো গুজব বা অনলাইন চাপের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। গত ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘পলিসি সামিটে’ আমি এই বিষয়গুলো পুনর্ব্যক্ত করেছি।
তিনি ভোটার ও সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, কোনো তৃতীয় পক্ষের ছড়ানো বর্ণনায় কান না দিয়ে জামায়াতের আনুষ্ঠানিক রেকর্ড, নীতি এবং ইশতেহার দেখে বিচার করতে।
নির্বাচনী প্রচারণার চূড়ান্ত পর্যায়ে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করবে জামায়াত। ডা. শফিকুর রহমান জানান, ওই ইশতেহারে নারীদের জন্য প্রকৃত নেতৃত্ব তৈরি এবং অর্থনৈতিক মর্যাদা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাগুলো আরও বিস্তারিত ও পরিমাপযোগ্য আকারে তুলে ধরা হবে।
তিনি তার বক্তব্যের ইতি টানেন একটি শক্তিশালী বার্তার মাধ্যমে— নারীর প্রতি সম্মান দেখানোই একটি এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের পরিচয়। আর সেই ভবিষ্যৎ গড়তেই জামায়াত কাজ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে জামায়াত আমিরের এই স্পষ্টীকরণ নারী ভোটারদের মন জয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ৩ ফেব্রুয়ারির ইশতেহারে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কী ধরণের রূপরেখা দেওয়া হয়।
এএন