দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন খেলাপিরা

শরিফ রুবেল প্রকাশিত: মে ২৯, ২০২২, ০৬:২০ এএম
  • মামলা পরিচালনায় উদাসীন ব্যাংক, শুনানিতেও উপস্থিত থাকে না
  • এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা
  • দক্ষ আইনজীবী নিয়োগেও সুফল মিলছে না
  • উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আবারো নিচ্ছেন নতুন ঋণ
  • আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন আইনজ্ঞরা

বাড়ছে খেলাপি ঋণ। দিন দিন সংকটে পড়ছে ব্যাংকগুলো। টাকা আদায়ে মামলা করেও কাজ হচ্ছে না। অর্থঋণ আদালতে মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। দীর্ঘকাল ঘুরেও মামলার ফলাফল আসছে না। নিষ্পত্তিতে লেগে যাচ্ছে সাত থেকে আট বছর। তবে দ্রুত নিষ্পত্তিতে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হলেও, গতি পায়নি লাখ লাখ মামলা। সারা দেশের অর্থঋণ আদালতগুলোয় খেলাপি ঋণের অর্থ আদায়ে মামলার অস্বাভাবিক জট পড়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতেই আটকে আছে প্রায় পাঁচ হাজার মামলা। কিন্তু সময়মতো শুনানিসহ আদালত-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় তৎপর নয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো, এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে। আর এ মামলা পরিচালনায় ব্যাংকের খরচ বেড়ে গিয়ে ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি হচ্ছে নানা জটিলতা। 

এদিকে শুধু বিচার-প্রক্রিয়ার জটিলতাই নয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার প্রবণতাও দেড় দশকে ক্রমেই বাড়ছে। এ নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিলেও কাজের কাজ হয়নি। মামলা তত্ত্বাবধানে ব্যাংকের উদাসীনতাও বেড়েছে। ব্যাংকের মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীদের সম্মানি দেয়া হয় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের চেয়ে কম। রয়েছে মামলা চালানো জনবল সংকটও। ফলে সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছে না দেশের ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার এ অদক্ষতা দূর করার ক্ষেত্রে অমনোযোগিতার অভিযোগও রয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে, তবে পরিমাণের দিক থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এ অর্থ সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকারদের দাবি, দক্ষ আইনজীবী নিয়োগেও সুফল মিলছে না। মামলার সংখ্যা বেশি থাকায় নিষ্পত্তিতে দেরি হচ্ছে। আর আইনের ফাঁকফোকর ও আইনের নানা দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন খেলাপি গ্রাহকরা। 

সমস্যা সমাধানে আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি করা হলেও এক যুগেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া রিট নিষ্পত্তির জন্য আইনজ্ঞদের আলাদা বেঞ্চ গঠনের পরামর্শ থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, মামলার শুনানিতে ঋণগ্রহীতা উপস্থিত থাকলেও অনুপস্থিত থাকেন ব্যাংকের প্রতিনিধিরা, যার সুবিধা পান ঋণখেলাপিরা। এ ছাড়া বিপুল মামলা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক প্যানেল আইনজীবী নেই। আইনজীবী ও মালিকপক্ষের মধ্যেও রয়েছে সমন্বয়হীনতা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আইনজীবীদের যে সম্মানি দেয়, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি সম্মানি পান বিবাদীপক্ষের আইনজীবীরা। এ কারণে সরকারি ব্যাংকের আইনজীবীরা মামলা পরিচালনায় অনীহা দেখান। মাঝে মধ্যে মামলা বিলম্ব করতে আসামিপক্ষ থেকে গোপন সুবিধা নেন ব্যাংকের আইনজীবীরা।

এ কথা বলছেন, ব্যাংকগুলোর প্যানেল আইনজীবীরাও। তাদের ভাষ্যমতে, এ সমস্যা থেকে উত্তরণে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি প্যানেল আইনজীবীদের সম্মানির পরিমাণ আরো বাড়ানো প্রয়োজন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মামলার  হয়রানি থেকে বাঁচতে  উচ্চ আদালতে রিট করেন খেলাপিরা। উচ্চ আদালত থেকে খেলাপি ঋণের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে ব্যাংক থেকে আবারো নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন। নতুন ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে আবারো খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। এভাবে একেকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ঋণখেলাপিরা যেন সুযোগ না পান সে জন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন আইনজ্ঞরা। তারা বলছেন, যারাই উচ্চ আদালতে রিট করবেন তাদেরকে আগে খেলাপি ঋণের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে। এভাবে আইন সংশোধন করলে ঋণখেলাপিরা আর সচরাচর উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন না।

এদিকে আইনজীবীরা বলছেন, ব্যবসার জন্য নেয়া ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে জমি, কারখানা বা স্থায়ী সম্পদ বন্ধক রাখতে হয় ব্যবসায়ীদের। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঋণের টাকা আদায় করা না গেলে আদালতে অনুমতি নিয়ে বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ঋণের অর্থ আদায় করে ব্যাংকগুলো। কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই আইনি জটিলতায় বন্ধকী সম্পদ দখলে নিতে পারছে না ব্যাংক। ফলে বাড়ছে ঋণ না আদায় অযোগ্য ঋণ। খেলাপি আদায় বাড়াতে অর্থঋণ আইন সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছেন-আইনজীবীরা। 

তারা বলছেন, অর্থ নিয়ে যদি মামলায় যাওয়া হয়, তাহলে পুরো বিষয়টিতে ৮ থেকে ৯ বছর লেগে যায়। এমনকি মালিকানা সনদ ইস্যু হওয়ার পরও মিউটেশন পাওয়া যায় না। নেয়া যাচ্ছে না দখল। এ জন্য অর্থ আদালত আইন-২০০৩ সংশোধনের কোনো বিকল্প নেই— বলছেন আইনজীবীরা। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি কি না সেটা আদালতে প্রমাণ করা কঠিন। তবে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হলে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করা উচিত। 

জানা গেছে, নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করায় ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। ব্যাংক খাতে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে এক লাখ তিন হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। দফায় দফায় ঋণ পুনঃতফসিলের পরও আদায় না হওয়ায় পরিণত হচ্ছে মন্দ ঋণে। আদায়ে বাধ্য হয়ে মামলা করছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু বছরের পর বছর মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের আদায়ও থেমে গেছে। ব্যাহত হচ্ছে সার্বিক কর্মকাণ্ড। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে ব্যয় বাড়ছে। ফলে একদিকে যেমন তারল্য সংকট তৈরি করছে, অন্যদিকে এর প্রভাবে ব্যাংকে আয় কমে গিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ভিত ক্রমান্বয়ে দুর্বল হচ্ছে। পাশাপাশি শিল্প ও এসএমই খাতে ঋণের প্রবাহ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। বন্ধকী বিক্রি করে খেলাপি ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। বাড়ছে, ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যা।

আইন অনুযায়ী দেশের সব জেলায় অর্থঋণ আদালত থাকার কথা থাকলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। সারা দেশের মাত্র ১১ অর্থঋণ আদালতের ওপর ভর করে চলছে খেলাপিদের মামলা। যেসব জেলায় অর্থঋণ আদালত নেই, সেখানে যুগ্ম জেলা জজ আদালত একই সাথে ফৌজদারি, দেওয়ানি ও অর্থঋণ মামলার বিচার পরিচালনা করেন। 

এতে অর্থঋণ আদালতের পাশাপাশি অন্য আদালতের বিচারকাজেও দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রিট, অর্থঋণ, সার্টিফিকেট, দেউলিয়া ও অন্যান্য মামলা মিলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুই লাখ ৭৭ হাজার ৯৪টি মামলা আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলার বিপরীতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুই লাখ ৫১ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা আটকে আছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্টিফিকেট মামলার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি, এক লাখ ৫২ হাজার ৬২৬টি। আবার এই সার্টিফিকেট মামলায় জড়িত টাকার পরিমাণ সবচেয়ে কম, দুই হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৬০ হাজার ৯৭৩টি। এসব মামলার বিপরীতে জড়িত রয়েছে এক লাখ ২৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। রিট মামলা আছে পাঁচ হাজারটি, যেগুলোতে জড়িত টাকার পরিমাণ ৩৪ হাজার ৭৮৮ কোটি। এ ছাড়া দেউলিয়া ও অন্যান্য মামলা রয়েছে ৫৮ হাজার ৪৯৫টি, এসব মামলার বিপরীতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ৮৪ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। 

অর্থঋণ আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো মামলা পরিচালনায় অমনোযোগী হওয়ায় কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া শেষ হয় না। ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে মনোযোগী হলে মামলার গতি আরো বেড়ে ব্যাংকের দায় আদায় সম্ভব হতো। এ ব্যর্থতার কারণে ব্যাংকের পাশাপাশি দেশীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি সাধারণ আমানতকারীর টাকা খেলাপিদের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য গঠিত অর্থঋণ আদালতের উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমরান আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আইনে যদি এরকম কোনো কথা বলা যায় যে, আসলে এই সম্পত্তির মালিক নিশ্চিতভাবে তিনি, যিনি মর্টগেজ দিয়েছেন, তাহলে এই জটিলতা অনেকাংশে কমে আসবে। ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই ব্যাংকের টাকা যারা ফেরত দিচ্ছেন না তাদের বিষয়ে আইন কঠোর করতে হবে। স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেভাবেই হোক না কেন, একজন ব্যক্তি খেলাপ করেছেন কি করেননি, এই বিষয়টি বের করে আনাটাই কঠিন। অর্থঋণ আদালত আইন যেমন সংশোধন প্রয়োজন, সেরকম সংশোধন প্রয়োজন দেউলিয়া আইন, ব্যাংক কোম্পানি আইন সবগুলো সময়ের প্রয়োজনে সংশোধন করা প্রয়োজন। 

অর্থঋণ আদালত অর্থঋণের বিষয়গুলো বিশেষভাবে দেখবে উচ্চ আদালতে যদি এইরকম একটি বেঞ্চ গঠন করা যায়, তাহলে এই মামলাগুলো খুব দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। এখন প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণের মামলা চলমান আছে অর্থঋণ আদালতে।’ 

এ বিষয়ে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজিবুল আলম বলেন, ‘মামলার চেয়ে আদালত ও আদালতে বিচারকের সংখ্যা কম হওয়ায় মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আদালত ও বিচারক বাড়ালে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।’ 

জানতে চাইলে সরকারি-বেসরকারি একাধিক ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী মোহাম্মদ নাঈম ভূঁইয়া বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের টাকা আদায়ে আইনজীবীদের সম্মানি দেয়ার বিষয়ে উদাসীন। বছরের পর বছর ব্যাংকের মামলা পরিচালনার সাথে যুক্ত হলেও সম্মানির হার বাড়ানোর বিষয়ে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। উল্টো করোনাকালে ব্যাংকগুলো মামলার আইনজীবীদের সম্মানি শতাংশের হারে কমিয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিল আটকে রাখার কারণেও আইনজীবীরা ডিক্রিদারের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে হতাশার মধ্যে পড়ে যান। এসব বিষয়ই মামলা দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তিতে বড় প্রভাব ফেলছে।’