স্মার্ট ভূমি ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার নতুন দিগন্ত: আমূল সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং ‘টেবিল-ঘুষের’ সংস্কৃতি ভেঙে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়েছে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার। নবনির্বাচিত ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এক ভিন্নধর্মী ‘অ্যাকশন মোড’ শুরু করেছেন। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই গোপনে মাঠ পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতে তাঁদের ঝটিকা সফর বা ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ এখন প্রশাসনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

তবে প্রশ্ন উঠছে শুধু এই ঝটিকা সফর কি ভূমি মালিকদের অনলাইনে খাজনা প্রদান, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং দশকের পর দশক ধরে ঝুলে থাকা মামলার সমাধান দিতে পারবে? নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং আইনের জটিল মারপ্যাঁচ কাটিয়ে নাগরিক নিশ্চয়তা দেওয়া এখন এই দুই নীতিনির্ধারকের সামনে এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা।

ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এবং প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সম্প্রতি দেশের বেশ কিছু ভূমি অফিসে সাধারণ পোশাকে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে পরিদর্শন করেছেন। এই পরিদর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল কর্মচারীদের উপস্থিতি, ফাইল নিষ্পত্তির গতি এবং সেবাগ্রহীতাদের সাথে আচরণের প্রকৃত চিত্র দেখা।

এই ধরনের আকস্মিক পরিদর্শন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ‘ভীতি’ তৈরি করেছে যা সাময়িকভাবে কাজের গতি বাড়ালেও দীর্ঘস্থায়ী সংস্কারের জন্য এটি পর্যাপ্ত নয়। মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "ফাইল আটকে রেখে মানুষকে হয়রানি করার দিন শেষ। আমরা শুধু অফিস দেখতে আসছি না, আমরা দেখতে আসছি মানুষ কতটুকু সেবা নিয়ে ফিরছে।"

নতুন সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ‘স্মার্ট ভূমি সেবা’। অনলাইনে খাজনা দেওয়া বা ই-নামজারি প্রক্রিয়া কাগজে-কলমে সহজ মনে হলেও বাস্তবে প্রযুক্তিগত অশিক্ষা এবং সার্ভার জটিলতা একটি বড় বাধা।

গ্রামীণ জনপদে অনেক ভূমি মালিকই এখনো স্মার্টফোন বা অনলাইনের বিষয়ে দক্ষ নন। এর ফলে তারা তথাকথিত ‘কম্পিউটার দোকান’ বা নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল দালাল’দের খপ্পরে পড়ছেন।

অনলাইনে আবেদন করার পরও অনেক ক্ষেত্রে সশরীরে তহশিল অফিসে ডাক পড়ে, যা দুর্নীতির সুযোগ খুলে দেয়। প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে এই আইনি জটিলতাগুলো চিহ্নিত করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন প্রতিটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ‘ডিজিটাল হেল্প ডেস্ক’ থাকে এবং মানুষ যাতে সরাসরি সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ফ্রি সেবা পায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভূমি অধিগ্রহণ (Land Acquisition) সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়। মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য জমি দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ অনেক সময় ন্যায্য পাওনা পান না, আবার পাওনা পেতে গেলেও মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিতে হয় ডিসি অফিসের এলএ (LA) শাখায়।

ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই এলএ শাখাগুলোকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, "অধিগ্রহণের টাকা এখন থেকে সরাসরি চেক বা ডিজিটাল ট্রান্সফারের মাধ্যমে মালিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যাবে, কোনো মধ্যস্বত্বভোগী এখানে স্থান পাবে না।" কিন্তু এই সরাসরি পেমেন্ট সিস্টেম নিশ্চিত করতে হলে শত বছরের পুরোনো রেকর্ড সংশোধন এবং পর্চা হালনাগাদ করা জরুরি।

বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক ভূমি সংক্রান্ত মামলা আদালতে বিচারাধীন। একটি মামলার রায় পেতে ১০ থেকে ২০ বছর লেগে যায়। ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আইনের এই মারপ্যাঁচ কমানোর লক্ষ্যে ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ এবং ‘ভূমি সংস্কার আইন ২০২৬’ এর আমূল পরিবর্তন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

প্রতিটি জেলায় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে যাতে দেওয়ানী আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে মানুষ দ্রুত সমাধান পায়।

সিএস (CS) থেকে শুরু করে বিআরএস (BRS) পর্যন্ত খতিয়ানের যে অমিল, তা দূর করতে স্যাটেলাইট ইমেজারি ও ড্রোন সার্ভে (DLMS) ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারে ‘ভূমি সংস্কার’ ছিল অন্যতম আকর্ষণ। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় মিজানুর রহমান মিনু ও ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে পাহাড়সম কিছু বাস্তবতার মোকাবিলা করতে হবে। 

তৃণমূল পর্যায়ের নায়েব ও কানুনগোদের একটি অংশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে খোলস পাল্টায়। তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করা এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা কঠিন।

অনেক মালিকের কাছেই মূল দলিল নেই বা জাল দলিলের ভিড়ে আসলটি খুঁজে পাওয়া কঠিন। ডিজিটাল রেকর্ডে ভুল তথ্য প্রবেশ করলে তা সংশোধন করা আরও বেশি জটিল।

ভূমিহীনদের পুনর্বাসন এবং সরকারি খাস জমি উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রভাবশালী মহলের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে নতুন সরকারকে।

মিজানুর রহমান মিনু ও ব্যারিস্টার কায়সার কামালের নেতৃত্বাধীন ভূমি মন্ত্রণালয় এখন ৫টি প্রধান কৌশলের ওপর ভিত্তি করে কাজ করছে।

প্রতিটি মৌজার ম্যাপ ডিজিটাল ও থ্রি-ডি (3D) আকারে থাকবে যাতে সীমানা বিরোধ চিরতরে শেষ হয়। ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ সরাসরি কেন্দ্রীয়ভাবে শোনার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।

প্রতিটি ফাইলের একটি ‘ট্র্যাকিং নম্বর’ থাকবে, যার মাধ্যমে মন্ত্রী নিজেও দেখতে পারবেন কেন নির্দিষ্ট একটি নামজারি দেরি হচ্ছে। ভূমি অফিসের সামনে কোনো বহিরাগত বা চিহ্নিত দালাল থাকলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পুলিশি ব্যবস্থার নির্দেশ।

ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এবং প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামালের ‘হংকার’ এবং গোপন পরিদর্শন মাঠ পর্যায়ে একটি ইতিবাচক কম্পন তৈরি করেছে। মানুষ এখন আশা করছে, অন্তত নিজের জমির খাজনা দিতে বা পর্চা তুলতে গিয়ে আর হয়রানির শিকার হতে হবে না।

তবে মনে রাখতে হবে, ভূমি অফিসের দুর্নীতি শত বছরের জঞ্জাল। শুধু পরিদর্শন দিয়ে এটি দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, স্বচ্ছতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। মিজানুর রহমান মিনুর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালের আইনি প্রজ্ঞা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবেই বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ‘ভিশন ২০৩০’ অর্জনে সক্ষম হবে।

জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা চায়। আগামী কয়েক মাস বলে দেবে, এই নতুন সরকারের ভূমি সংস্কার কর্মসূচি মানুষের দীর্ঘদিনের কান্না মুছতে পারবে কি না।

এএন