এক দশকের তলানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ: স্থবির অর্থনীতির বৃত্তে বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ এখন এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় উপনীত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪–২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২.০৩ শতাংশ। গত ১০ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন হার, যা দেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিনিয়োগের ক্রমাবনতি ও বর্তমান চিত্র

বিবিএস-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত চার বছর ধরেই জিডিপিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের অবদান ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে এই বিনিয়োগের হার ছিল ২৪.৫ শতাংশ, তা কয়েক দফা কমে এখন ২২ শতাংশের ঘরে নেমেছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিনিয়োগের এই নিম্নগতি দেখা গিয়েছিল।

গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দেশের জিডিপির আকার চলতি মূল্যে ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। বিপরীতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা হলেও বেসরকারি খাতের অবদান ছিল মাত্র ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।

‘চতুর্মুখী আক্রমণ’: সিপিডি’র বিশ্লেষণ

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এই পরিস্থিতিকে ‘চতুর্মুখী আক্রমণের ফল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিনিয়োগের এই মন্দা কেবল একটি কারণে নয়, বরং চারটি প্রধান দিকের সম্মিলিত প্রভাবে ঘটেছে। 

১. রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা: অন্তর্বর্তী সরকারের স্থায়িত্ব এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। একটি নির্বাচিত সরকার আসার আগ পর্যন্ত বড় বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না উদ্যোক্তারা।

২. সংকুচিত মুদ্রানীতি: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীর্ঘ সময় ধরে পলিসি রেট ও ঋণের সুদের হার (১৩-১৪ শতাংশ) বেশি রাখা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসার খরচ বেড়েছে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়েছে।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: চাঁদাবাজি বন্ধ করা, প্রশাসনিক হয়রানি কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করার ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।

৪. বৈশ্বিক অস্থিরতা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকি এবং বিশ্ববাণিজ্যে অনিশ্চয়তার প্রভাব বাংলাদেশের মতো রফতানিমুখী অর্থনীতিতে পড়েছে।

বিনিয়োগ খরা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ৩.৪৯ শতাংশে। এটি ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনার সময়কার ৩.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ঠিক পরবর্তী সর্বনিম্ন অবস্থান। অর্থাৎ, বিগত দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে শ্লথগতি পার করছে।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার দীর্ঘ ব্লকেড, কারফিউ এবং ইন্টারনেট শাটডাউনের প্রভাব পুরো অর্থবছরের অর্থনীতিকে ওলটপালট করে দিয়েছে। ওই সময় কয়েক সপ্তাহ সব ধরনের শিল্প উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন থমকে ছিল। বিগত সরকারের আমলের বিনিয়োগ খরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একইভাবে বজায় থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগে ধস

গত অর্থবছরে মাত্র ৫৫ কোটি ডলারের নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) এসেছে দেশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করে বরং ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ (Wait and See) নীতি গ্রহণ করেছেন। স্থানীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এই বিমুখতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগকে আবারও ২২ শতাংশ থেকে ২৬-২৭ শতাংশে নিয়ে যেতে না পারলে বিপুল সংখ্যক বেকারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এজন্য প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক রোডম্যাপ, জ্বালানি (গ্যাস-বিদ্যুৎ) সরবরাহে বিশেষ অগ্রাধিকার, ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, চাঁদাবাজি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

বেসরকারি বিনিয়োগের এই খরা কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানোর স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারের চাকা সচল করা।

এএন