দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার আধুনিকায়নে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বছরের প্রথম দিন বিনামূল্যে নতুন বই তুলে দেওয়ার যে অভূতপূর্ব উদ্যোগ, তার নেপথ্যে রয়েছে এনসিটিবির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।
প্রধান কার্যক্রম
এনসিটিবির প্রধান কাজ হলো দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, উন্নয়ন, নবায়ন ও নিরীক্ষণ।
বোর্ডের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে, বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, উন্নয়ন, নবায়ন ও সংস্কার। শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের কার্যকারিতা যাচাই ও মূল্যায়ন। পাঠ্যপুস্তকের পান্ডুলিপি প্রণয়ন ও সম্পাদনা। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষা উপকরণ তৈরি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন। ডিজিটাল মিথস্ক্রিয় পুস্তক (ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল পাঠ্যপুস্তক) তৈরি ও অনুমোদন। পাঠ্যপুস্তকের মুদ্রণ, প্রকাশনা, বিতরণ ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা।
সরকার ঘোষিত শ্রেণি ও স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বই বিতরণ। সহায়ক শিক্ষণ-শেখানো সামগ্রী, পুরস্কার বই, রেফারেন্স বই অনুমোদন। বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মকাণ্ডে দান ও অনুদান প্রদান। সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে অর্পিত অন্যান্য দায়িত্ব সম্পাদন।
শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি উন্নয়ন
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে শিক্ষাক্রমকে সময়োপযোগী ও আধুনিক রাখা। দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যসূচি হালনাগাদ করা হয়। এ জন্য গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের মতামত নিয়ে পাঠ্যপুস্তকে নতুন ধারণা, তথ্য ও পদ্ধতি সংযোজন করা হয়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে বোর্ড শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কেন্দ্র (এনসিডিসি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে কাজ করে। এতে শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী জ্ঞান লাভ করে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে ওঠে।
পান্ডুলিপি তৈরি ও সম্পাদনা
পাঠ্যপুস্তক তৈরির ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হলো পান্ডুলিপি তৈরি। এ কাজে দেশের অভিজ্ঞ শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিষয় বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হয়। পান্ডুলিপি তৈরি শেষে তা বিভিন্ন ধাপে পর্যালোচনা ও সম্পাদনা করা হয়। মান নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করার পরেই তা প্রকাশনার জন্য অনুমোদিত হয়।
প্রকাশনা ও বিতরণ
এনসিটিবির অন্যতম বড় সাফল্য হলো সময়মতো দেশের সব বিদ্যালয়ে বই পৌঁছে দেওয়া। প্রতিবছর জানুয়ারির প্রথম দিন “বই উৎসব”-এর মাধ্যমে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হয়। এটি বাংলাদেশকে বিশ্বের নজিরবিহীন উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
অফিসারদের ভূমিকা ও দায়িত্ব
এনসিটিবির কর্মকর্তারা বিভিন্ন ধাপে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাদের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে— শিক্ষাক্রম উন্নয়নের জন্য গবেষণা ও নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন। প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা ও সচিবালয়ের কার্যক্রম তদারকি। লেখক, প্রকাশক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ডেটা ব্যবস্থাপনা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও তথ্য আদান-প্রদান। বই প্রকাশের পর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিতরণ ও তদারকি।
নবায়ন ও সংস্কার কার্যক্রম
শিক্ষার্থীদের শেখার মান উন্নত করতে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে এনসিটিবি নিয়মিত পাঠ্যপুস্তক নবায়ন ও সংস্কার করে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বইয়ে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা, শিখন-কেন্দ্রিক পদ্ধতি ও ডিজিটাল কন্টেন্ট সংযোজন করা হয়েছে।
সমন্বয়মূলক কার্যক্রম
এনসিটিবি কেবল বই প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কেন্দ্র, প্রকাশনা সংস্থা এবং বিভিন্ন এনজিওর সাথে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর ফলে পাঠ্যপুস্তক তৈরির প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়।
প্রযুক্তির ব্যবহার
বর্তমান ডিজিটাল যুগে এনসিটিবি তথ্যপ্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে। ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং বই সম্পর্কিত মতামত গ্রহণের জন্য ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এতে কাজের গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ত্রুটি কমছে।
চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে এনসিটিবি বর্তমানে শিক্ষার মানোন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তার নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে বোর্ডের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
গুরুত্ব ও সামাজিক প্রভাব
এনসিটিবির কর্মকাণ্ড দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ বাড়িয়েছে, ঝরে পড়ার হার কমিয়েছে এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি প্রশংসিত হচ্ছে।
এইচআর/ইএইচ