সাম্প্রতিক সময়ে একটি ‘গুজব’ যা আলোচনার বিষয় হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, সারা দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে সারের ডিলারদের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে সরকার নীতিমালা পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা করছে।
বর্তমানে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে সারের ডিলার রয়েছে, যিনি উপজেলা কৃষি অফিসারের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট পরিমাণ সার কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে থাকেন। কিন্তু নতুন এই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়নে আরও তিনটি ওয়ার্ড ভিত্তিক ডিলার নিয়োগের চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানা গেছে।
যদিও সরকার এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেয়নি। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা এবং কৃষিবিদদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। অনেকেই মনে করছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিলারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সার বিতরণ আরও সহজ হবে।
অন্যদিকে অনেক বিশেষজ্ঞ ও মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এতে বরং নিয়ন্ত্রণহীনতা, অনিয়ম এবং সিন্ডিকেট বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় সার বিতরণ: কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও সাফল্যের উদাহরণ
বর্তমানে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে অনুমোদিত সার ডিলার রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার ও তার অধীনস্থ এসও (সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট এগ্রিকালচার অফিসার) কর্মকর্তারা প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে উপস্থিত থেকে সার বিতরণ কার্যক্রম তদারকি করেন। প্রতিটি ডিলার সরকার নির্ধারিত দরে কৃষকদের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার সরবরাহ করে থাকেন।
উপজেলা কৃষি অফিসাররা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে নজরদারি রাখেন যাতে কোনো ধরনের অতিরিক্ত দাম, মজুদ বা কালোবাজারি না ঘটে।
অনেক উপজেলায় দেখা গেছে, কৃষকরা সরাসরি ডিলার পয়েন্টে গিয়ে সহজেই সার সংগ্রহ করছেন এবং বর্তমানে কোথাও কোনো প্রকৃত সারের সংকট নেই।
কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ঠিক সময়ে ঠিক দামে সার পাচ্ছি। সরকারি কর্মকর্তারা এসে সার বিতরণ তদারকি করেন, তাই অনিয়মের কোন সুযোগ নেই।’
নীতিমালা পরিবর্তনের চিন্তা
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং বিএডিসির কিছু কর্মকর্তাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিলার সংখ্যা বাড়ালে সার আরও সহজে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। এ কারণেই তিনটি ওয়ার্ড ভিত্তিক নতুন ডিলার নিয়োগের একটি প্রস্তাবনা প্রণয়নের কথা উঠেছে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা এই ধারণার বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, বর্তমানে একটি ইউনিয়নে একটি ডিলার থাকলেও উপজেলা কৃষি অফিসারদের জন্য সেটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। সেখানে যদি ডিলার সংখ্যা তিনগুণ বাড়ানো হয়, তাহলে উপজেলা কৃষি অফিসারের পক্ষে এত বিপুল সংখ্যক ডিলারকে মনিটর করা কার্যত অসম্ভব হয়ে যাবে।
কৃষিবিদ ইমদাদুল হক বলেন, “ডিলার সংখ্যা বাড়ানো মানে মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারানো। যখন একটি উপজেলায় ৩০–৪০ জন ডিলার হবে, তখন অফিসাররা কার উপর নজর রাখবেন? এতে সারের দাম বেড়ে যাবে, সিন্ডিকেট তৈরি হবে, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ডিলার সংখ্যা বৃদ্ধি: সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বাস্তব চিত্র
কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় একজন উপজেলা কৃষি অফিসার ও তার অধীনস্থ কয়েকজন এসও কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। এই অল্প সংখ্যক কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বর্তমান কাঠামোয় যদি প্রতিটি ইউনিয়নে ৩ জন করে অতিরিক্ত ডিলার যুক্ত করা হয়, তবে একটি উপজেলায় ডিলারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৪০–৫০ জন। এই বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অল্পসংখ্যক অফিসার এত বড় ডিলার নেটওয়ার্ক তদারকি করতে পারবেন না। একাধিক ডিলার নিজেদের মধ্যে মূল্য বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ডিলাররা কৃষকের নামে সার তুলে অন্যত্র বিক্রি করার ঝুঁকি বাড়বে। প্রকৃত কৃষক সময়মতো সারের অভাবে ভুগবেন। তদারকি ব্যর্থ হলে সরকারি দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে সার বিতরণে কোনো বড় ধরনের সমস্যা নেই। কোথাও কোথাও সাময়িক সংকট দেখা দিলেও তা দ্রুত সমাধান করা হয় উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসের তদারকিতে।
কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, “সারের সংকট এখন আর নেই। কিছু লোক আছে যারা গুজব ছড়ায়। আমরা সময়মতো সার পাচ্ছি। সরকার যদি বরাদ্দ একটু বাড়ায় তাহলে আরও ভালো হবে।”
আরেকজন কৃষক বলেন, “ডিলার বাড়িয়ে লাভ হবে না, বরং বিভ্রান্তি বাড়বে। এখনকার মতো একটি ডিলার থাকলেই ভালো।
‘ডিলার নয় বরং বরাদ্দ বাড়ানোই সমাধান’
বেশিরভাগ কৃষিবিদ মনে করেন, সারের বর্তমান বিতরণ কাঠামো কার্যকরভাবে বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ। বরং সরকার যদি সার সরবরাহের বরাদ্দ ও তদারকি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে, তাহলে কৃষকরা সহজেই প্রয়োজনীয় সার পাবে।
একজন কৃষিবিদ বলেন, “ডিলার বাড়ালে সমস্যা কমবে না, বরং দ্বিগুণ হবে। বরাদ্দ কিছুটা বাড়ালে এবং মনিটরিং শক্তিশালী করলে কৃষকের কোনো কষ্ট থাকবে না।”
একই মত দেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক উপ-পরিচালকও। তার মতে, “বর্তমানে ডিলার সংখ্যা যথেষ্ট। আমাদের প্রয়োজন সঠিক তদারকি ও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা, নতুন ডিলার নয়।”
বর্তমান বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা জানিয়েছেন একজন কৃষি কর্মকর্তা। তার মতে, প্রতিটি ডিলারের লেনদেন অনলাইনে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা। প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে নিয়মিত পরিদর্শনের জন্য টাস্কফোর্স গঠন। যাতে প্রকৃত কৃষক ছাড়া অন্য কেউ সরকারি সার না পায়। কৃষকরা যাতে ফোন বা অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারেন। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ বাড়ানো এবং মজুদ পর্যাপ্ত রাখা।
এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে কোনো অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগ না করেও সার বিতরণে আরও স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আনা সম্ভব।
বাংলাদেশের কৃষি আজ বিশ্বের একটি সফল উদাহরণ। এই সফলতার পেছনে সরকারের সহায়তা ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু অতি উৎসাহী সিদ্ধান্ত বা অপ্রয়োজনীয় নীতিমালা পরিবর্তন কৃষি প্রশাসনের এই সফল কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে।
বর্তমানে সার বিতরণ ব্যবস্থায় বড় কোনো সংকট নেই। সংকট আছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অপতৎপরতা ও গুজবে। সুতরাং, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
একটি ইউনিয়নে একটি ডিলারই যথেষ্ট তাতে করে নিয়ন্ত্রণ থাকবে, স্বচ্ছতা বজায় থাকবে, আর কৃষকও তার প্রয়োজনীয় সার সঠিক সময়ে পাবে। বরাদ্দ ও তদারকিই হোক ভবিষ্যৎ নীতির মূল ভিত্তি।