দীর্ঘ ১৭ বছর পর গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানো এই রাজনীতিক এবার মুখোমুখি হলেন বিবিসি বাংলার।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান, যা আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায় সেই অভ্যুত্থান এবং বিএনপির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন তিনি।
এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিবিসি বাংলার সম্পাদক মীর সাব্বির ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কাদির কল্লোল।
সোমবার সকালে বিবিসি বাংলা প্রকাশ করেছে সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব, যেটি ছিল ৪০ মিনিটেরও বেশি। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হবে আগামীকাল মঙ্গলবার।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তিনি নিজেকে জুলাই অভ্যুত্থানের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দেখেন না।
তিনি বলেন, “না, আমি কখনোই জুলাই আন্দোলনে নিজেকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দেখি না। এই আন্দোলন সফল হয়েছে জুলাই মাসে, কিন্তু এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে বহু বছর আগে থেকে। এই আন্দোলন জনগণের, কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়।”
তারেক রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী, বিএনপি হোক বা অন্য দল সকলেই এই আন্দোলনের অংশ ছিল।
“প্রত্যেক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছে। তাদের অনেকেই নির্যাতিত হয়েছে, কারাবরণ করেছে, কেউ প্রাণ হারিয়েছে। তিনি মনে করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এসে দেশের জনগণ একযোগে সব গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন তারেক রহমান। দুর্নীতি ও রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে দেশ ছাড়ার পর থেকে এই ১৭ বছর তিনি লন্ডনে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সরাসরি সাক্ষাৎকার দেননি। ফলে এবারের সাক্ষাৎকারটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।
বিবিসির প্রশ্ন আপনি নিজেকে জুলাই আন্দোলনের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে দেখেন? এর উত্তরে তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তি বা দল নয়, বাংলাদেশের জনগণই এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড। কারণ, এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক, গৃহিণী, ছাত্র, গার্মেন্টস শ্রমিক, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা পর্যন্ত।
তারেক রহমান সাক্ষাৎকারে বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা দেখেছি মাদ্রাসার ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, এমনকি স্কুলপড়ুয়া তরুণরাও রাস্তায় নেমেছে। গৃহিণীরা সন্তানদের পেছনে থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। কৃষক, শ্রমিক, সিএনজি চালক, ছোট দোকানদার থেকে গার্মেন্টস কর্মীরা পর্যন্ত মাঠে ছিলেন। আমরা দেখেছি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, যারা আগে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, তারাও সম্পৃক্ত হয়েছিলেন এই আন্দোলনে। তাই, আমি মনে করি এটি জনগণেরই আন্দোলন, কোনো ব্যক্তির নয়।
বিবিসি বাংলার প্রশ্ন ছিল—“জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আপনি ছাত্র নেতৃত্বের সঙ্গে কতটা যোগাযোগ রেখেছিলেন?” এর উত্তরে তারেক রহমান বলেন, “আমি যেহেতু দেশের বাইরে ছিলাম, যোগাযোগ রাখতে হয়েছে অনলাইনের মাধ্যমে। কিন্তু সেদিনের পরিস্থিতি সবাই জানেন স্বৈরাচারী সরকার টেলিফোন ও অনলাইন সিস্টেম বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই যোগাযোগ সবসময় সহজ ছিল না। কখনও সরাসরি, কখনও পরোক্ষভাবে যোগাযোগ রাখতে হয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে।”
তিনি আরও বলেন, বিএনপি বা তার নিজস্ব টিমের পক্ষ থেকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সংগঠন ও নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করা হয়েছে, তবে এটি কখনোই “একক নেতৃত্বাধীন আন্দোলন” ছিল না।
বিবিসির এক প্রশ্নে, জুলাই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে বিএনপির ভেতরে বা বাইরে থেকে বিভিন্ন দাবি উত্থাপিত হচ্ছে এ বিষয়ে মত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা যদি বাংলাদেশের ইতিহাস দেখি, এটি একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। এই আন্দোলনে মানুষের আত্মত্যাগের যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, তা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে খুব কমই দেখা যায়।”
তিনি আবেগভরে উল্লেখ করেন, “এই আন্দোলনে ৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সাধারণত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শিশু শহীদ হয় না। কিন্তু এই আন্দোলনে শিশু, নারী, শ্রমিক সবাই প্রাণ দিয়েছেন।”
তারেক রহমান আরও বলেন, “আমি আগেই বলেছি, এই আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো দলের নয়, এটি বাংলাদেশের জনগণের। কেউ দাবি করতে পারেন, সেটি তাদের অবস্থান। তবে আমাদের দলের অবস্থান স্পষ্ট এটি জনগণের আন্দোলন, জনগণের সফলতা।
বিবিসির প্রশ্নে, আন্দোলনের সময়ের সহিংসতা ও প্রাণহানির দায় বিএনপি কতটা নেবে এর জবাবে তারেক রহমান বলেন, “আমরা মনে করি, এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। ২০০০-এর মতো মানুষ শহীদ হয়েছেন, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত বা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। কেউ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, কেউ পরিবার হারিয়েছেন। এখন আমাদের, রাষ্ট্রের এবং সরকারের দায়িত্ব হলো তাদের পাশে দাঁড়ানো, সহযোগিতা করা।”
তিনি যোগ করেন, “আন্দোলন শেষ হয়েছে, সফলতা জনগণ অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে সেই ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে বিবিসি জানতে চায় তিনি কবে দেশে ফিরবেন বা পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না।
এ বিষয়ে সরাসরি উত্তর না দিলেও তারেক রহমান বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতি এখন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রের বিকাশে যেকোনো সিদ্ধান্ত জনগণের স্বার্থে নেওয়া হবে। আমি ও আমার দল সেই লক্ষ্যে কাজ করছি।”
তিনি ইঙ্গিত দেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং আইনি জটিলতা কাটলে দেশে ফেরার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকার ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বার্তা বহন করছে।
একদিকে তিনি “জনগণই মাস্টারমাইন্ড” বলে রাজনৈতিক কৃতিত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন, অন্যদিকে তিনি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন যা আগামী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘ নির্বাসনের পর এ সাক্ষাৎকার তারেক রহমানের ‘রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বাভাস’ হতে পারে। তবে তিনি আপাতত সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেননি।
বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হবে মঙ্গলবার সকাল ৮টায়, যেখানে তারেক রহমান তার দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার রোডম্যাপ এবং বিদেশে অবস্থানকালীন রাজনৈতিক কর্মকৌশল নিয়ে বিস্তারিত বলবেন।
১৭ বছর পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মুখ খুলে তারেক রহমান একদিকে জনগণের আন্দোলনের কৃতিত্ব জনগণকেই দিয়েছেন, অন্যদিকে শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।
এই সাক্ষাৎকার নতুন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দিয়েছে তাকে যেখানে মূল বার্তা ছিল একটাই— “গণতন্ত্রের জন্য লড়াই কারো ব্যক্তিগত নয়, এটি জনগণের লড়াই।”
ইএইচ