এক কেজি কাঁচা মরিচের দাম ২৬০ টাকা, পেঁয়াজ ৯০ টাকা, আর ডিমের দাম পিসপ্রতি ১৫ টাকা। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিনে দিনে সীমিত হয়ে আসছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শুধু একজন গৃহিণীর নয়, দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে বাধ্য করছে অর্ধেক কেনাকাটা করতে অথবা প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস বাদ দিতে।
অক্টোবর মাসের শুরু থেকেই দেশের সবজির বাজারে মূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। শীতকালীন সবজি এখনও বাজারে ওঠেনি, আর গ্রীষ্মকালীন সবজির মৌসুম শেষ হয়ে গেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে সবজির। তাছাড়া, দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধিও এই মূল্যবৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে।
রাজধানীর শ্যামবাজার, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী সব জায়গার চিত্র প্রায় একই। প্রতিদিন সকালে বাজারে গেলে চোখ কপালে ওঠে।
এসব বাজারে আলুর কেজি ৪০–৫০ টাকা, পেঁয়াজ দেশি ৮৫–৯৫ টাকা, আমদানি করা পেঁয়াজ ৭৫–৮০ টাকা, টমেটো ২০০ টাকা, কাঁচামরিচ ২৪০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, ধনেপাতা ২৫০ টাকা কেজি, ডিম ডজন ১৬০ টাকা, চাল মাঝারি মানের প্রতি কেজি ৬৫–৭৫ টাকা।
এই দাম শুনে শুধু চোখ বড় হয় না, বুকেও আগুন লাগে।
রিকশাচালক নূর ইসলাম প্রতিদিন ৭০০–৮০০ টাকা আয় করেন। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। বাজার করতে এসে তিনি অসহায় কণ্ঠে বলেন, ‘আগে ১০০ টাকায় তিনটা সবজি কিনতাম, এখন একটাই পাই না। ভাত খাই, তরকারি কমাই। ছেলেপুলে মাংস দেখলে এখন শুধু তাকায়, কিনতে পারি না।’
রাজশাহীর গৃহিণী নাজমা বেগম বলেন, ‘সবকিছুর দাম বেড়েছে। আলু আর ডিম তো আমাদের শেষ ভরসা ছিল, এখন সেটাও নাগালের বাইরে। সংসার চালাতে প্রতিদিন হিসাবের খাতা নতুন করে লিখতে হচ্ছে।’
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে গ্রামের মানুষও রেহাই পাচ্ছে না। স্থানীয় হাটে সবজি কম আসছে, আর আসলেও দাম অনেক বেশি। অনেক পরিবার এখন নিজেরা আঙিনায় শাকসবজি চাষ শুরু করেছে, অন্তত খরচ কিছুটা বাঁচানোর আশায়।
বাজারে সবজির দাম বাড়লেও কৃষকরা এর পুরো সুফল পাচ্ছেন না। কারণ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে সার, ডিজেল, বীজ, শ্রমিকের মজুরি সব কিছুর দামই আগের চেয়ে অনেক বেশি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষক জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা মাঠে যে দাম পাই, সেটা বাজারের অর্ধেকও না। পাইকাররা একচেটিয়া করে দাম বাড়ায়। আমরা খরচের টাকা উঠাতেই হিমশিম খাই।’
অন্যদিকে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এই মৌসুমে বৃষ্টির কারণে ফসল নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে কুমড়া, শিম, লাউ, পটলসহ অনেক সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল সমস্যা সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট। পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে যে দীর্ঘ শৃঙ্খল, তাতে প্রতিটি ধাপে কিছু কিছু করে দাম বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. সালেহ আহমেদ বলেন, ‘সরকার যখনই বাজার মনিটরিংয়ে শিথিলতা দেখায়, তখনই সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়। পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তারা দাম বাড়ায়। এই চক্র ভাঙা না গেলে সাধারণ মানুষ সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
পরিবহন খরচও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কয়েক দফা ডিজেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। তার ওপর বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় রাস্তা কাদা-পানিতে ডুবে যাওয়ায় সবজি পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে পচন ধরছে, ক্ষতি হচ্ছে ব্যবসায়ীদের, আর সেই ক্ষতির বোঝা গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর।
খুলনা থেকে ঢাকায় সবজি আনা এক পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, ‘এক ট্রাক সবজি আনতে আগে খরচ হতো ১৫ হাজার টাকা, এখন লাগে ২২ হাজার। এর কমে দিলে ড্রাইভার কেউ রাজি হয় না।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১১.৪ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মাঝে মাঝে বাজার পরিদর্শন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেও এর প্রভাব সাময়িক। দাম কমে না, বরং পরের দিন আবার বেড়ে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘বাজারে দাম বাড়লে আমরা তদারকি করি, কিন্তু স্থায়ী কোনো নীতি নেই। মূলত পাইকারি বাজারে নিয়ন্ত্রণ না আনলে খুচরা বাজারে কিছুই বদলাবে না।’
বাজারের আগুনে শুধু খাবার টেবিল নয়, গোটা জীবনযাত্রাই বদলে যাচ্ছে। অনেকে এখন সপ্তাহে একবার বাজার করেন, প্রতিদিন নয়। পরিবারে ডিম-মাংসের পরিবর্তে ডাল ও আলুর ব্যবহার বেড়েছে। স্কুলগামী শিশুদের টিফিনেও কাটছাঁট। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ধার-দেনায় জর্জরিত।
মিরপুরের গৃহিণী রুবিনা আক্তার বলেন, “আগে সপ্তাহে দুদিন মাংস রান্না করতাম, এখন মাসে একদিনও পারি না। ছেলেমেয়েদের বলি‘ভালো দিন আসবে, তখন খাও।’ কিন্তু কবে আসবে সেই ভালো দিন?”
সরকার ইতোমধ্যে টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রি করছে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অতি সীমিত। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ টিসিবির ট্রাকের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াচ্ছে। অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে।
সম্প্রতি বাণিজ্য উপদেষ্টা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। অতিরিক্ত দাম বাড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে সাধারণ মানুষ বলছে কঠোর ব্যবস্থা নয়, তারা চায় বাস্তব পরিবর্তন।
নিত্যপণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে বাজার বিশেষজ্ঞরা বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
তাদের মতে, সরাসরি কৃষক থেকে ভোক্তাদের কাছে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে। সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা আনতে হবে; প্রতিটি স্তরের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা জরুরি। সারাদেশে হিমাগার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে মৌসুমি সংকট অনেকটা কমানো সম্ভব। বৃষ্টিজনিত ক্ষতির পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে, যাতে ফসলের ক্ষতি আগে থেকেই কমানো যায়। মনিটরিং টাস্কফোর্সের স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে নিয়মিতভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সবশেষে, সাধারণ মানুষ নিজ নিজ উপায়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কেউ ছাদের বাগানে সবজি ফলাচ্ছে, কেউ বাজারে দর কষাকষি করে কম দামে কেনার চেষ্টায় ব্যস্ত।
তবু চোখেমুখে একটাই প্রশ্ন—এই আগুন বাজারে কবে শান্তি ফিরে আসবে?
শীতের মৌসুম আসছে, নতুন ফসলের আশায় অপেক্ষা করছে মানুষ। কিন্তু তার আগে যদি বাজারে স্থিতি ফেরে না, তবে সামনে শীত নয়, আসবে আরেক দফা দুর্ভিক্ষের হাহাকার।
ইএইচ