নিয়ন্ত্রণহীন দামে দিশেহারা সাধারণ মানুষ

বেপরোয়া ওষুধের বাজার

তানজিদ সরওয়ার প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৫, ০৪:১৭ পিএম
  • রোগের চেয়ে বেশি আতঙ্কিত ওষুধের দামে
  • দাম বাড়ছে প্রতিদিন, নিয়ন্ত্রণ নেই কোথাও
  • ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির অযৌক্তিক দাম নির্ধারণ

দেশের ওষুধের বাজার যেন এক অদৃশ্য দখলযুদ্ধের ময়দান। প্রতিদিন নতুন নতুন নাম, নতুন প্যাকেট, নতুন দাম, কিন্তু মান ও মূল্য কোথায় যাচ্ছে তার হিসাব রাখার যেন কেউ নেই। চিকিৎসার আশায় মানুষ ফার্মেসিতে যায় জীবন বাঁচাতে, কিন্তু অনেক সময় সেই ফার্মেসিই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

দেশজুড়ে আজ ওষুধের দাম এমনভাবে বেড়েছে যে, সাধারণ মানুষ তো বটেই মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষও এখন প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়, কিনবে না ফেরত যাবে?

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানির সংখ্যা ৩০০’রও বেশি। এর মধ্যে ৫০টির মতো কোম্পানি প্রায় ৮০ শতাংশ বাজার দখলে রেখেছে। এই বাজারে প্রতিযোগিতা নেই, আছে শুধুই প্রভাব ও লবিং। একেক কোম্পানি একেক ওষুধের দাম নির্ধারণ করছে ইচ্ছেমতো।

একটি সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট যেটির উৎপাদন খরচ ২ টাকা, সেটি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২৫ টাকায়। প্যারাসিটামল, এসিডিটি ও ব্লাড প্রেসার জাতীয় ওষুধের দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে গত তিন বছরে। কিন্তু সরকারি নির্ধারিত মূল্যতালিকা কোথায়? সেই তালিকা খুঁজে পেতেই যেন কষ্ট হয়।

ফার্মেসির কর্মচারীদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, “স্যার কোম্পানি দাম বাড়াইছে। আমাদের কিছু করার নাই।”

সরকারি সংস্থা ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিজিডিএ) এর তদারকি কার্যক্রম কাগজে আছে, কিন্তু মাঠে প্রায় নেই বললেই চলে।

রাজধানীতে যারা বসবাস করেন, তাদের বিকল্প কিছু থাকে বড় ফার্মেসি, ডাক্তারের পরামর্শ বা অনলাইন দামের ধারণা। কিন্তু গ্রামের মানুষ? তারা নির্ভর করে স্থানীয় ফার্মেসির দোকানদারের কথার ওপর। দোকানদার যা বলে, তাই দিয়ে ওষুধ কিনে খায়।

চিকিৎসকরা বলেন, গ্রামে ওষুধ বিক্রেতা মানেই অর্ধেক ডাক্তার। অথচ তাদের কারও মেডিকেল প্রশিক্ষণ নেই, অধিকাংশের নেই বৈধ লাইসেন্স। ফলাফল রোগী ভুল ওষুধ খেয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এমনকি নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধও চলছে অবাধে। প্রশাসন অভিযানে আসে মাঝে মাঝে, কিন্তু তাতে বাজারে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন দেখা যায় না।

বাংলাদেশের ওষুধ খাতে এখন কয়েকটি বড় কোম্পানির একচেটিয়া দাপট। এই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পর্ক এমনভাবে জড়িত যে, কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থাই স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে না।

একজন ওষুধ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, ‘বড় কোম্পানিগুলোর মার্কেটিং অফিসাররা ডাক্তারদের ঘুষ দেয়, গিফট দেয়, বিদেশ সফর স্পন্সর করে। তারা প্রেসক্রিপশনেই ওষুধ বিক্রি করে, দরকার নেই রোগীর উপকারের। তাই রোগীর নয়, ব্যবসার স্বার্থই এখন প্রধান। 

তিনি আরও বলেন, এই চক্র শুধু দাম বাড়ায় না, প্রয়োজনে বাজারে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করে। বিশেষ করে যেসব ওষুধ দীর্ঘস্থায়ী রোগে (ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হার্ট, লিভার) প্রয়োজন, সেগুলোর দাম এক রাতেই ২০–৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরকম কঠোর পদক্ষেপ দেখা যায় না।

আজকের বাংলাদেশে চিকিৎসা মানে কেবল ডাক্তার দেখানো নয় বরং কিস্তিতে জীবন বাঁচানো।

একজন স্কুলশিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, ‘ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে যখন ফার্মেসিতে যাই, দেখি ১ হাজার টাকার ওষুধে দাম লিখে ১৭০০ টাকা নিচ্ছে। ছেলে-মেয়ের পড়ার খরচ রেখে এখন ওষুধ কিনতেই কষ্ট হয়।

এমন অভিযোগ এখন প্রতিটি মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এমনকি নিম্ন আয়ের পরিবারেরও।

ফার্মেসিগুলো প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ত কিন্তু বিক্রি কমে গেছে। কারণ মানুষ এখন অর্ধেক ওষুধ কিনে, বাকিটা বাদ দেয়। কেউ কেউ পুরনো প্রেসক্রিপশন থেকে সস্তা বিকল্প খুঁজে নেয়, যা অনেক সময় প্রাণঘাতীও হতে পারে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) এই প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র কাগজে-কলমে শক্তিশালী, কিন্তু মাঠে দুর্বল। দেশে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হয়, অথচ এই বিশাল বাজারের ওপর নজর রাখার মতো কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র কয়েক শত। তদারকির ঘাটতি, ঘুষ-দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ফার্মেসিগুলো কার্যত নিজস্ব নিয়মেই চলে।

অনেক জেলা শহরে দেখা গেছে, নকল ওষুধ ধরা পড়লেও মামলা হয় না, কারণ প্রভাবশালী কোম্পানির নাম জড়িত থাকে। 

অন্যদিকে, সাধারণ জনগণ জানেই না কোন ওষুধের দাম সরকার নির্ধারণ করেছে, কোনটা অতি মুনাফা নিচ্ছে। ফলে দাম নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে প্রতিদিন।

ফার্মাসিউটিক্যাল বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ওষুধ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে হলে তিনটি পদক্ষেপ নেয়া খুবই জরুরি। 

তাদের মতে, প্রতিটি ওষুধের উৎপাদন খরচ ও বাজারদর বিশ্লেষণ করে সরকারকে নতুনভাবে দাম নির্ধারণ করতে হবে। অনলাইনে সহজে পাওয়া যাবে এমন একটি জাতীয় ডাটাবেইস তৈরি করা দরকার, যাতে ক্রেতা জানতে পারে আসল দাম কত। যারা নকল বা অতিরিক্ত দামে ওষুধ বিক্রি করবে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ ফৌজদারি মামলা করতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। ওষুধ এখন ব্যবসার পণ্য নয়, জীবন রক্ষার হাতিয়ার হওয়া উচিত।

বাংলাদেশে এখন মানুষ অসুস্থ হলে যতটা ভয় পায় রোগকে, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় ওষুধের দামকে। যে দেশে একজন রিকশাচালক নিজের সন্তানের জ্বরের ওষুধ কিনতে গিয়ে তিনদিন না খেয়ে থাকে, সে দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্যের গল্প কেবল শিরোনামে শোভা পায়।

ওষুধ কোম্পানিগুলো লাভ করছে কোটি কোটি টাকা, কিন্তু সাধারণ মানুষ হারাচ্ছে তাদের জীবনের নিশ্চয়তা। এখন প্রশ্ন একটাই এই লাগামহীন মেডিসিন বাজার কে থামাবে? সরকার নাকি রোগীর মৃত্যু?

ইএইচ