বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে কক্সবাজারের সাগর পাড়। উত্তরের চা-বাগানের শহর সিলেট, কিংবা পার্বত্য বান্দরবানের নীল পাহাড় সব জায়গাতেই অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টায় মানুষের ঢল নামে।
কেউ আসে ঢাকার ধোঁয়া-ধুলা থেকে একটু মুক্তি নিতে, কেউ প্রকৃতির শান্তিতে মন ভরাতে। এই সময়টিই দেশে পর্যটনের প্রধান মৌসুম, যাকে বলা হয় “সিজন”।
কিন্তু পর্যটনের এই প্রসার যতটা আনন্দের, ততটাই উদ্বেগেরও। প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষয়, অবৈধ ও অগোছালো নির্মাণ, আর আবর্জনায় ভরা সৈকত এসব দৃশ্য আজ আমাদের পর্যটন শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি পর্যটনকে শুধুই বিনোদন হিসেবে দেখব, নাকি দায়িত্বের অংশ হিসেবে ভাবব?
বাংলাদেশে পর্যটন এখন আর শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, এটি দেশের অর্থনীতির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার খাত।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। এই খাত সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করছে। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, স্থানীয় পণ্য বিক্রি, যানবাহন সব মিলিয়ে একটি সক্রিয় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয় পর্যটন মৌসুমে।
তবে, অর্থনীতির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার ভারসাম্য না থাকলে এই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যটন বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আরেফিন বলেন,“বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি যদি দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে পরিবেশ ও স্থানীয় সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও ঐতিহ্য মিলিয়ে বাংলাদেশ পর্যটনের এক অনন্য সম্ভাবনার দেশ। তবে, অপরিকল্পিত রিসোর্ট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার এসব সমস্যা এখন বড় হুমকি।
কক্সবাজারের লাবণী সৈকতে প্রতিদিন গড়ে ১০–১২ টন বর্জ্য জমা হয়, যার বেশিরভাগই প্লাস্টিক ও খাবারের মোড়ক।
বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় পর্যটকদের অসচেতন আচরণে প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, স্থানীয়দের জীবনযাত্রাও প্রভাবিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই পর্যটন মানে শুধু প্রকৃতি রক্ষা নয়, স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করা, তাদের অর্থনৈতিক অংশীদার করা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান করা।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) দেশের পর্যটন শিল্পের প্রধান নীতিনির্ধারক সংস্থা।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) নুজহাত ইয়াসমিন বলেন,“আমাদের লক্ষ্য হলো দায়িত্বশীল পর্যটনের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানের একটি আকর্ষণীয় ও টেকসই পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা।”
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মূল কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে— পর্যটন উন্নয়নের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, নতুন পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিতকরণ ও উন্নয়ন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচারণা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের সমন্বয় এবং পর্যটন পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রদান।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ইতোমধ্যে নদীভিত্তিক পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন ও ইকো-ট্যুরিজম বিকাশে একাধিক বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
তাদের মতে, “ভ্রমণ” যেন কেবল দেখা নয় বরং শেখার, সংরক্ষণের ও সম্মান করার প্রক্রিয়া হয় সেদিকেই জোর দিচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড সম্প্রতি পর্যটকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা দিয়েছে, যা অনুসরণ করলে ভ্রমণ আরও দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব হতে পারে। যেমন, এমন হোটেল বা রিসোর্টে থাকুন, যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। অপ্রত্যাশিত বিপদ বা প্রতারণা এড়াতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সহায়তা করতে এটি অপরিহার্য। ভ্রমণ শেষে বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন; পুনর্ব্যবহারের চেষ্টা করুন। স্থানীয়দের ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখানোই দায়িত্বশীল ভ্রমণের অংশ। বনের গাছ না কাটা, পাহাড়ে শব্দদূষণ না করা, নদী-সাগরে ময়লা না ফেলা এসব ছোট কাজই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশ্বব্যাপী পর্যটন শিল্প জিডিপিতে গড়ে ১০ শতাংশ অবদান রাখে। বাংলাদেশে এই হার এখন প্রায় ৪.৪ শতাংশ, যা ক্রমেই বাড়ছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই পর্যটন নীতি অনুসরণ করলে আগামী দশকে এই খাত দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব উৎসে পরিণত হতে পারে। পর্যটন খাতের বিস্তারে স্থানীয় জনগোষ্ঠীও অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হচ্ছে।
রাঙামাটির তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যটকদের জন্য পাহাড়ি ট্রেইল গাইডিং, হোমস্টে ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির কাজ করছি। পর্যটক বাড়লে আমাদের আয়ের সুযোগও বাড়ে। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে টেকসই পর্যটন।’
তবে এই খাতে চ্যালেঞ্জও কম নয়। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, ভূমি দখল, বন ধ্বংস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি সব মিলিয়ে পর্যটন অনেক জায়গায় প্রকৃতি ধ্বংসের কারণ হচ্ছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক সমন্বয়, সঠিক তদারকি ও পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না হলে সমস্যাগুলো আরও গভীর হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, পর্যটন মানে উন্নয়ন, কিন্তু সেটা যদি পরিবেশের ক্ষতির বিনিময়ে হয়, তাহলে সেটি উন্নয়ন নয়, সেটি ধ্বংস।
এ ছাড়া পর্যটন সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সচেতনতামূলক প্রচারণা এসবও এখন জরুরি চাহিদা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেমন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও নেপাল দায়িত্বশীল পর্যটনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই দেশগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পর্যটনকে জীবিকা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের মাধ্যম বানিয়েছে।
বাংলাদেশও চাইলে একই পথ অনুসরণ করতে পারে। সুন্দরবন, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার চারপাশে নদীভিত্তিক পর্যটন, কিংবা পাহাড়ে কমিউনিটি ট্যুরিজম সব ক্ষেত্রেই সরকার ও জনগণের যৌথ উদ্যোগে একটি নতুন অর্থনৈতিক অধ্যায় লেখা সম্ভব।
বাংলাদেশের পর্যটন এখন এক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে। একদিকে রয়েছে অপরিমেয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ ঝুঁকি।
দায়িত্বশীল ও টেকসই পর্যটনের মাধ্যমে এই ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। পর্যটন কেবল আনন্দের জন্য নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি যেন তারা পায় এক সবুজ, সুন্দর, প্রাণবন্ত বাংলাদেশ।
ইএইচ