জুলাই সনদে স্বাক্ষর: ঐক্যের পথে নতুন যাত্রা

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২৫, ০৭:৩৮ পিএম

অবশেষে দীর্ঘ আলোচনার পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’এ স্বাক্ষর করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। 

শুক্রবার বিকাল পাঁচটায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে এ ঐতিহাসিক সনদে স্বাক্ষর করেন তারা।

দেশের রাজনীতিতে ‘নতুন ঐক্যের’ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই জুলাই সনদে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বিকাল সাড়ে চারটায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানস্থলে একে একে যোগ দেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকেরা।

বিকাল সাড়ে ৪টার পর অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তার সঙ্গে ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলসহ জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং অন্যান্য উপদেষ্টারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, উপদেষ্টা শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরার, খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব।

জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

বিএনপির পক্ষে স্বাক্ষর করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও সনদে স্বাক্ষর করেন।
এছাড়া এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসানও এতে সই করেন।

স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। আমরা সবাই মিলে এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যেখানে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও নাগরিক মর্যাদা একসঙ্গে বিকশিত হবে।’

স্বাক্ষরের পর তিনি দক্ষিণ প্লাজায় প্রতীকীভাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’এর নথি উন্মোচন করেন।

তবে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করেনি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদে স্বাক্ষর থেকে বিরত ছিল।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এনসিপি জানায়, “আইনি ভিত্তি ও সাংবিধানিক নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না।’

এছাড়া বামধারার চার দল, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ সনদে সই করেনি।

এই দলগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা সংশোধিত খসড়া হাতে না পেলে স্বাক্ষর করবে না।

অনুষ্ঠান শুরুর আগে কিছুটা উত্তেজনারও সৃষ্টি হয়। বেলা ১টার দিকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে একদল তরুণ অনুষ্ঠানস্থলে অবস্থান নেয় এবং সনদে কিছু ধারা পরিবর্তনের দাবি তোলে। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের সরাতে গেলে সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের সরিয়ে দেয়, তবে এতে কয়েকজন আহত হয় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ ঘটনায় উপস্থিত রাজনৈতিক নেতারা দুঃখ প্রকাশ করেন।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘জুলাই সনদের মতো ঐক্যের দিনে এরকম ঘটনা লজ্জাজনক। যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, তাদের উচিত সংলাপের মাধ্যমে মতপ্রকাশ করা, সংঘর্ষের মাধ্যমে নয়।’

সিনিয়র আইনজীবী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা শিশির মনির বলেন, “জুলাই যোদ্ধারা তিনটি দাবি উত্থাপন করেছিল, যার কিছু কমিশন ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছে। তাদের আর উদ্বেগের কারণ থাকা উচিত নয়।”

বেলা আড়াইটা নাগাদ রাজধানীতে বৃষ্টি নামলে অনুষ্ঠানের শুরু কিছুটা বিলম্বিত হয়। 

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, ‘প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনুষ্ঠান কিছুটা দেরিতে শুরু হতে পারে, তবে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। আমাদের ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা দেখার অপেক্ষায় আছি।’

বৃষ্টি থামার পরই বিকেল সাড়ে চারটায় অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয়। প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত জনতা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়।

ঐক্যমত্য কমিশনের ভূমিকা

জুলাই সনদ প্রণয়নের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন। ধারাবাহিক সংলাপ, খসড়া প্রণয়ন ও সংশোধনের মধ্যদিয়ে কমিশন ২৫টি রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের মতামত গ্রহণ করে।

কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আজকের এই সনদ নিখুঁত নয়, কিন্তু এটি আমাদের সমঝোতার একটি বাস্তব ভিত্তি। ভিন্নমত থাকলেও আমরা সবাই যে সংলাপের টেবিলে ফিরতে পেরেছি, সেটিই বড় অর্জন।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘খুব ভালো সনদ হতে যাচ্ছে। এখানে কিছু নোট অব ডিসেন্ট আছে, সেগুলো কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। যারা আজ সই করেননি, তাদেরও ভবিষ্যতে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি এই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে গণতন্ত্রের পথে একটি শক্ত যাত্রা শুরু হবে।’

জুলাই যোদ্ধাদের দাবি ও রাজনৈতিক দলের মতামতের মুখে দুপুর দুইটার দিকে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন পঞ্চম দফা সংশোধন আনে।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন জানায়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের নিশ্চয়তা, অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার সীমা এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা সংক্রান্ত ধারাগুলো হালনাগাদ করা হয়েছে।

এ পরিবর্তনের পরই বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দল স্বাক্ষরে সম্মতি জানায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই সনদে উল্লেখ করা হয়েছে

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক নির্যাতনের অবসান

প্রশাসন ও পুলিশে সংস্কার

দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা

নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা এবং সংলাপের সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, ইউনূস সরকারের উদ্যোগে এই সনদ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আস্থার বাতি জ্বালিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হবে।

অনুষ্ঠান শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যারা আজ সই করেছি, তারা শুধু কাগজে নয় মনে-প্রাণে একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার স্বাক্ষর দিয়েছি। আমাদের প্রতিশ্রুতি থাকবে, কোনো মতবিরোধ সংলাপের বাইরে যাবে না।‘

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আজকের সনদ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধতার প্রতীক। আমরা চাই বাংলাদেশে আর কখনো ‘অবিশ্বাসের রাজনীতি’ ফিরে না আসুক।’

বৃষ্টিভেজা বিকালে দক্ষিণ প্লাজার মঞ্চে বাজছিল জাতীয় সংগীতের সুর, মঞ্চে হাসিমুখে ছিলেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিরা। 

তবে সেই হাসির আড়ালে এখনো অনেক প্রশ্ন বাকি। এই সনদ কি সত্যিই ঐক্যের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে, নাকি রাজনৈতিকসন্দেহ-অবিশ্বাস আবারও তাকে ভেঙে দেবে?

আজকের স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সেই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর দেয়নি, তবুও ইতিহাসের পাতায় ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখটি হয়তো লেখা থাকবে। যেদিন বাংলাদেশে ভিন্ন মতের মানুষ এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংলাপের শপথ নিয়েছিল।

ইএইচ