ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ধোঁয়া এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ছড়িয়ে থাকা পোড়া কাগজ, ভস্মীভূত প্যাকেজ, গলে যাওয়া লোহার কাঠামো আর পুড়ে যাওয়া নথিপত্র এখনো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে।
বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হলেও স্বাভাবিক হয়নি শিডিউল। শত শত যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন বিমানবন্দরের বিভিন্ন টার্মিনালে। বিদেশগামী যাত্রীদের অনেকে ফ্লাইট মিস করেছেন, আবার অনেক বিদেশি এয়ারলাইন্স সাময়িকভাবে কার্গো সেবা স্থগিত রেখেছে।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার লিমা খানম বলেন, আগুন এখনও পুরোপুরি নির্বাপণে আসেনি। এজন্য ধোঁয়া উড়ছে। তবে আমাদের ২২ ইউনিট আগুন নির্বাপণের কাজ করছে। আগুন যেন বাড়তে না পারে সেজন্য অনবরত পানি ছিটানো হচ্ছে।
এদিকে, সকাল থেকেই বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ধ্বংসস্তূপ দেখতে আসছেন ভুক্তভোগীরা। উৎসুক জনতার ভিড়ও দেখা গেছে। তবে ভেতরে কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টে কর্মরত রেজাউল করিম রনি বলেন, শুক্র-শনিবার আমদানি বন্ধ থাকে। কিন্তু রপ্তানি সবসময় খোলা থাকে। সেই সুবাদে শনিবার দিন সকালে আমি এক্সপোর্ট করতে আসি। বৃহস্পতিবার আমরা টাকাও জমা দিয়েছি। কিন্তু মালামাল নিতে পারিনি। রোববার নেওয়ার কথা ছিল। এর আগেই সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, আগুনের প্রভাব পড়বে দেশের তৈরি পোশাক কারখানায়। কারণ এখানে এমন পণ্য সবচেয়ে বেশি ছিল। তবে শনিবার বা ছুটির দিন এমন ঘটনা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। এছাড়া আগুনে হাজারও কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দেশের বিমান নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সমন্বয় ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের শুরু, পরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্যাকেজিং ও স্টোরেজ এলাকায়।
এ সময় ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রায় ৭ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভানো গেলেও ভেতরের গুদামঘর, রপ্তানির জন্য প্রস্তুত পোশাক, ইলেকট্রনিক পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে লাগা আগুন নেভাতে গিয়ে অন্তত ২৯ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১৫ জন ভর্তি রয়েছেন। আর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ জন।
রোববার সকালে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানায়, বিমানবন্দরে আগুনের এখন পর্যন্ত বিমানবাহিনীর একজন, ফায়ার সার্ভিসের তিনজন, পুলিশের একজন, আনসারের ১০ জন সদস্য সিএমএইচে চিকিৎসাধীন।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক লে. কর্নেল ফখরুল আলম জানিয়েছেন, এই হাসপাতালে ১৪ জন আনসার সদস্য গত শনিবার রাতে চিকিৎসা নিয়ে চলে যান।
গত শনিবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিমানবন্দরের কার্গো সেকশনে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। একে একে ৩৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। যোগ দেয় সেনা, নৌবাহিনী ও বিজিবি। রাত সোয়া ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
কার্গো ভিলেজ মূলত রপ্তানি ও আমদানির পণ্য পরিবহনের প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন এখান দিয়ে প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ টন কার্গো পণ্য প্রক্রিয়াজাত ও প্রেরণ করা হয়। ফলে আগুনের ঘটনায় কেবল স্থানীয় ক্ষতিই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চেইনেও বড় প্রভাব পড়েছে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন জানিয়েছেন, এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে অচল করার এক ধরনের পরিকল্পিত নাশকতা হতে পারে। তদন্তে নাশকতার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মিললে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এয়ারলাইন্স ও কার্গো হ্যান্ডলিং এজেন্সিগুলোর জন্য আগামী তিন দিন অতিরিক্ত ফ্লাইটের সব চার্জ মওকুফ করা হবে। এতে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের দুর্ঘটনা বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দেয়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ফার্মাসিউটিক্যাল রপ্তানিতে পণ্য পাঠাতে দেরি হলে আন্তর্জাতিক সময়সূচি ভেঙে যায়, যার আর্থিক প্রভাব সরাসরি জাতীয় রপ্তানি আয়ে পড়ে।
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার শাহজালাল বিমানবন্দর। এমন জায়গায় বারবার অগ্নিকাণ্ড ঘটছে এটিই বড় উদ্বেগের কারণ। গত কয়েক বছরে বিমানবন্দরের ভেতরে বা আশপাশে অন্তত পাঁচবার ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) আহসান কবির বলেন, বিমানবন্দর এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রতিটি বাল্ব, তার, প্লাগ, এমনকি ধুলো পরিষ্কার রাখাও নিরাপত্তার অংশ। এখানে আগুন মানেই শুধু দুর্ঘটনা নয়, সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কা।
তিনি আরও বলেন, আগুন লাগার পর জরুরি অ্যালার্ম, স্প্রিংকলার সিস্টেম, স্মোক সেন্সর এসবের কোনটি সঠিকভাবে কাজ করেনি বলে তথ্য মিলছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ফ্লাইট চলাচল আংশিক চালু হলেও আগুনের ধোঁয়া ও টার্মিনালের বিশৃঙ্খলায় যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ফ্লাইট ধরতে পারেননি।
একজন প্রবাসী যাত্রী বলেন, আমি সকাল ৯টায় এসেছি, এখন রাত ৮টা এখনও ফ্লাইটের সময় পাচ্ছি না। কেউ কিছু বলতে পারছে না। শুধু বলছে ‘আগুন, অপেক্ষা করুন’।
বাংলাদেশ বিমানের দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। আরও ১০টির বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, বিমান চলাচল স্বাভাবিক করতে অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। এর মধ্যে ক্লিয়ারেন্স, কার্গো পুনর্বিন্যাস ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার সময় দেখা গেছে, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে থাকা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা আগুনের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র পুরোনো, অনেক জায়গায় অকেজো, আর ভেতরের রাসায়নিক পদার্থগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত না থাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে।
একজন ফায়ার কর্মী বলেন, প্রথম ২০ মিনিট আমরা ভেতরে ঢুকতে পারিনি। প্রচুর ধোঁয়া, উত্তাপ ও গ্যাসের কারণে দেখা যাচ্ছিল না কিছুই। পরে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
সরকার ইতিমধ্যে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে—বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস, এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলাদা আলাদা তদন্ত করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যদি নাশকতা বা পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। জনগণকে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই রাষ্ট্র প্রস্তুত আছে।
তবে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে প্রস্তুতি থাকলে এমন দুর্ঘটনা ঘটল কীভাবে? বিশেষ করে বিমানবন্দর মতো কৌশলগত স্থানে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা দুর্বল থাকা প্রশাসনিক অদক্ষতারই প্রতিচ্ছবি বলে মনে করছেন অনেকে।
বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলো বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত কার্গো হাব। বছরে প্রায় ৩.৫ লাখ টন পণ্য এখান দিয়ে যায়। এই অগ্নিকাণ্ড আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ও বীমা কোম্পানিগুলোর আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন বিদেশি কার্গো এজেন্ট বলেন, আগে থেকেই আমরা বিলম্ব ও নিরাপত্তা ঘাটতির মুখে পড়তাম। এখন যদি আগুনের ঝুঁকিও বাড়ে, তাহলে অনেক ক্রেতা বিকল্প পথে পণ্য পাঠাতে চাইবে। এর ফলে দেশের রপ্তানি খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শিল্প নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সংস্কার করতে হবে। নয়তো এর পুনরাবৃত্তি আবারও হবে।
তাদের মতে, বিমানবন্দরগুলোর অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা অবিলম্বে আধুনিকীকরণ করতে হবে। নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ (সিসিটিভি, সেন্সর) নিশ্চিত করতে হবে। নাশকতার সম্ভাবনা মাথায় রেখে প্রতিটি কৌশলগত স্থাপনায় ইন্টেলিজেন্স ভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে দায়হীনতা সংস্কৃতির অবসান হয়।
ইএইচ