কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনলাইনে ঘোষিত ‘লকডাউন’ কর্মসূচি ঠেকাতে সারাদেশে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সম্ভাব্য নাশকতা ও সহিংসতা রোধে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে ইতিমধ্যে পুলিশের তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে, আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নজরদারি কার্যক্রম বাড়িয়েছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নাশকতা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, যে কোনো ব্যক্তি নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে এমন সন্দেহ দেখা দিলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে কোনো অরাজকতা সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে এ বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
রাজধানীতে বাড়তি তল্লাশি ও প্রস্তুতি: ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকা, রামপুরা, মহাখালী, গাবতলী ও যাত্রাবাড়ী প্রবেশমুখে পুলিশ ও র্যাবের টহল বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গাড়ি তল্লাশি, পরিচয় যাচাই ও সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয়।
পুলিশ জানায়, লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের মতো ঘটনা প্রতিরোধে এই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নাশকতার আশঙ্কা: বৈঠকে উপস্থাপিত একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ রাজধানীতে অবস্থান নিচ্ছে এবং তারা সহিংসতা ছড়ানোর পরিকল্পনা করতে পারে। বিশেষ করে বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ বাড়ছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়-ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে সম্ভাব্য স্থানে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও আটক করা হবে।
খোলা জ্বালানি তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা: সভায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকায় রাস্তার পাশে খোলা জ্বালানি তেল বিক্রি হওয়ায় তা অগ্নিসংযোগে ব্যবহৃত হতে পারে। এজন্য নির্বাচনের আগ পর্যন্ত খোলা তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত হয়। তেল বিক্রি এখন থেকে কেবল নির্ধারিত পাম্প ও অনুমোদিত বিক্রেতাদের মাধ্যমেই করা যাবে।
বাহিনীর সরঞ্জাম ও নতুন পোশাক: সভায় নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে 'বডিওর্ন ক্যামেরা' ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া র্যাব ও আনসার বাহিনীর জন্য নতুন পোশাক চূড়ান্ত করা হয়েছে। আনসারদের জন্য নির্ধারিত নতুন রঙ ও নকশা শিগগিরই মাঠপর্যায়ে চালু হবে, আর র্যাবের পোশাকে আনা হবে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন।
অবৈধ অস্ত্র ও মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার: বৈঠকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। উপদেষ্টা বলেন, যে অস্ত্রগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলো দ্রুত উদ্ধার করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও জানান, গ্রামাঞ্চলে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে এটা রোধে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য।
সীমান্তে সতর্কতা জোরদার: নির্বাচনকে সামনে রেখে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কোনো সন্ত্রাসী বা অস্ত্রধারী দেশে প্রবেশ করতে পারে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। উপদেষ্টা জানান, সীমান্তে এখন অতিরিক্ত নজরদারি চলছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কাস্টমসকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো অনুপ্রবেশ বা অস্ত্র চোরাচালান না ঘটে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে বার্তা: আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানানো হয়, তারা যেন শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের কর্মসূচি পালন করে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করে। সভায় একজন বাহিনীর প্রতিনিধি বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেবল শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করবে, তবে প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
জনসচেতনতা ও সহযোগিতার আহ্বান: ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নাশকতা বা সহিংসতার কোনো আলামত দেখলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করুন। এটি কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, নাগরিক সচেতনতারও বিষয়।
তিনি বলেন, আমরা চাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও নিরাপদ সমাজ। এজন্য সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
সরকার মনে করছে, নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এখন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সে লক্ষ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ একযোগে চালানো হচ্ছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শুধু আইন নয়, জনগণের সচেতন অংশগ্রহণও জরুরি-এমন বার্তাই এসেছে মঙ্গলবারের বৈঠক থেকে।
জেএইচআর