রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক মানবসেবার প্রতীক জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন ইনস্টিটিউট, যা সাধারণভাবে সবাই পঙ্গু হাসপাতাল নামেই চেনে।
দেশে যখন উন্নত অস্থি ও পঙ্গু চিকিৎসা ছিল একেবারেই সীমিত, তখন ১৯৭২ সালে তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল আজ কোটি মানুষের পুনর্জীবনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এটি দেশের একমাত্র অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসনমূলক বিশেষায়িত হাসপাতাল, যেখানে দুর্ঘটনা, জন্মগত ত্রুটি, কিংবা রোগজনিত কারণে চলাফেরা অক্ষম হয়ে পড়া মানুষরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে ফিরে পাচ্ছেন নতুন জীবনের আশ্বাস।
জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালে বর্তমানে ১০০০ শয্যা বিশিষ্ট ইনডোর বিভাগ এবং দৈনিক দেড় হাজারের বেশি বহির্বিভাগের রোগী সেবা প্রদান করা হয়।
প্রতিদিনই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগীরা আসেন ভাঙা হাড়, মেরুদণ্ডের আঘাত, কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন, অথবা দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি সেবা নিতে।
হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম তিনটি স্তরে বিভক্ত, অর্থোপেডিক সার্জারি, ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন, প্রস্থেটিক ও অর্থোটিক সেবা।
এছাড়া, জরুরি রোগীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা খোলা রয়েছে ট্রমা ও ইমার্জেন্সি ইউনিট, যেখানে সড়ক দুর্ঘটনা, শিল্প দুর্ঘটনা কিংবা হঠাৎ অঙ্গভঙ্গের রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা শুধু চিকিৎসাই করেন না, বরং রোগীদের জীবন ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থোপেডিক সার্জন, ফিজিওথেরাপিস্ট ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।
হাসপাতালের একজন সিনিয়র অর্থোপেডিক অধ্যাপক আমার সংবাদকে বলেন, আমরা কেবল শরীর সারাই না; আমরা মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে চাই। একটি পা হারানো মানে জীবনের সব আশা হারানো নয় বরং নতুনভাবে বেঁচে থাকার সূচনা।
একজন সিনিয়র ডাক্তার ও তার সহকর্মীরা প্রতিদিন কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন, মেরুদণ্ড সার্জারি, জন্মগত বিকলাঙ্গতা সংশোধনসহ শতাধিক অপারেশন পরিচালনা করেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট, যারা রোগীদের হাঁটা শেখানো থেকে শুরু করে কাজের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করেন।
অর্থোপেডিক চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পুনর্বাসন যেখানে রোগী শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও পুনরায় সমাজে ফিরতে পারেন। পঙ্গু হাসপাতালের রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ এই কাজটিই করে থাকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে।
দুর্ঘটনা বা অঙ্গচ্ছেদের পর রোগীদের এখানে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অনেক রোগী যারা কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন, তাদের জন্য হাসপাতাল পেশাভিত্তিক পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনা করছে, যাতে তারা নিজেই কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারেন।
এখানে একটি বিশেষ ইউনিট আছে প্রস্থেটিক অ্যান্ড অর্থোটিক বিভাগ, যেখানে কৃত্রিম হাত-পা, হাঁটু বা সাপোর্টিং ব্রেস তৈরি করা হয়। এই কৃত্রিম অঙ্গগুলো দেশেই তৈরি হচ্ছে, ফলে এর খরচ অনেক কম। দরিদ্র রোগীদের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে এসব সেবা দিয়ে থাকে।
পঙ্গু হাসপাতাল শুধু চিকিৎসার ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও অনন্য। এটি দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে অর্থোপেডিক সার্জন, ফিজিওথেরাপিস্ট ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞদের জন্য বিশেষায়িত কোর্স ও ট্রেনিং প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়।
প্রতি বছর শতাধিক নতুন চিকিৎসক ও থেরাপিস্ট এখানে ইন্টার্নশিপ ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। হাসপাতালে চালু রয়েছে আধুনিক গবেষণাগার, যেখানে হাড় পুনর্গঠন, জয়েন্ট প্রতিস্থাপন ও ট্রমা সার্জারির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের রিকশাচালক আবদুল কাদের বলেন, দুর্ঘটনায় আমার দুই পা ভেঙে যায়। ভাবছিলাম আর হাঁটতে পারব না। পঙ্গু হাসপাতালে দুই মাস চিকিৎসা নিয়েছি, এখন আবার নিজে হেঁটে কাজে ফিরেছি।
আরেকজন নারী রোগী রিনা বেগম। তিনি একটি কারখানায় দুর্ঘটনায় হাত হারিয়েছিলেন। বললেন, এখানে কৃত্রিম হাত লাগানোর পর আমি আবার কাজ শুরু করতে পেরেছি। মনে হয়, আমি আবার নতুন জীবন পেয়েছি।
এমন শত শত গল্প প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে এই হাসপাতালের করিডোরে। প্রতিটি গল্প প্রমাণ করছে চিকিৎসা কেবল ওষুধে নয়, মানবিক স্পর্শেও সম্পূর্ণ হয়।
বর্তমানে পঙ্গু হাসপাতাল ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, অনলাইন পরামর্শ, এবং ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড (EMR) সিস্টেম চালু করেছে। দূরবর্তী জেলার রোগীরা এখন ভিডিও কলের মাধ্যমে চিকিৎসকদের পরামর্শ পাচ্ছেন।
এছাড়া কৃত্রিম অঙ্গ নির্মাণ বিভাগে যুক্ত হয়েছে থ্রিডি স্ক্যানার ও মডেল প্রিন্টার, যা আরও নিখুঁত প্রস্থেটিক অঙ্গ তৈরি করতে সহায়তা করছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে মোবাইল রিহ্যাব ক্লিনিক ও বিভাগীয় স্যাটেলাইট সেন্টার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে গ্রামীণ পর্যায়ের রোগীরাও সমান সেবা পান।
পঙ্গু হাসপাতালের সেবা আজ বিশ্বমানের কাছাকাছি হলেও, এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রতিদিন অতিরিক্ত রোগীর চাপ, সীমিত সংখ্যক সার্জন, পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং বাজেট ঘাটতি এই চারটি বিষয় এখন বড় প্রতিবন্ধকতা।
চিকিৎসকরা মনে করেন, হাসপাতালের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হলে বেড সংখ্যা বৃদ্ধি, জেলা পর্যায়ে উপ-হাসপাতাল স্থাপন এবং বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। এছাড়া পুনর্বাসন প্রশিক্ষণকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আনলে আরও দক্ষ থেরাপিস্ট তৈরি হবে।
একজন চিকিৎসকের বলেন, প্রতিটি রোগীর পেছনে একটি গল্প আছে তাদের হারানো স্বপ্ন, তাদের কষ্ট, তাদের নতুন করে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা। পঙ্গু হাসপাতাল তাদের শুধু চিকিৎসা দেয় না, তাদের জীবনে আলো জ্বালিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, যদি সরকার ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করে, তবে পঙ্গু হাসপাতালকে এশিয়ার অন্যতম উন্নত অর্থোপেডিক সেন্টারে রূপ দেওয়া সম্ভব।
আজ পঙ্গু হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাকেন্দ্র নয় এটি মানবতার প্রতীক, পুনর্জীবনের এক বিদ্যালয়। অঙ্গহানিদের চোখে যে অশ্রু, চিকিৎসক ও নার্সদের নিবেদিত সেবায় তা পরিণত হয় হাসিতে। এখানে প্রতিদিন মানুষ শিখছে জীবন থেমে থাকে না, যত বড় দুর্ঘটনাই ঘটুক না কেন।
জাতীয় পঙ্গু হাসপাতাল আজ বাংলাদেশের মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। চিকিৎসা, গবেষণা, পুনর্বাসন ও শিক্ষা চারটি ক্ষেত্রেই এই প্রতিষ্ঠান অবদান রাখছে দেশের অগণিত অক্ষম ও দুর্ঘটনাপ্রবণ মানুষের জীবনে।
অর্থোপেডিক চিকিৎসা কেবল হাড়ের চিকিৎসা নয়; এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার চিকিৎসা। এই দর্শনকেই সামনে রেখে পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীরা এগিয়ে চলেছেন নিরবচ্ছিন্ন সেবার পথে যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই মানবতার জন্য, প্রতিটি চিকিৎসাই নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি।
জেএইচআর/ইএইচ